রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো। একই সঙ্গে আগামী ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর সিদ্ধান্ত নেন।
আদালত সূত্র জানায়, এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, রামিসাকে কৌশলে বাসা থেকে ডেকে এনে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে তাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে মৃত ভেবে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে শরীরের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে দাবি করেন, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা হয়েছে এবং কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই।
শুনানি শেষে বিচারক দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ পড়ে শোনানোর সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চাইলেও সোহেল রানাকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এদিকে স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনানোর সময় বলা হয়, তিনি হত্যাকাণ্ডে বাধা না দিয়ে আলামত নষ্টে সহায়তা করেছেন। বিচারক জানতে চাইলে স্বপ্না কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এ সময় সোহেল রানা আদালতে বলেন, তার স্ত্রীর কোনো দোষ নেই।
শুনানি শেষে আদালত কক্ষের বাইরে এবং পরে কারাগারে নেওয়ার পথে সোহেল রানা নতুন একটি দাবি করেন। তিনি বলেন, রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছেন ‘ডলার’ নামে আরেক ব্যক্তি। তার দাবি, তিনি শুধু মরদেহ টুকরো করেছেন।
সোহেল আরও বলেন, ডলার নামের ওই ব্যক্তি তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, মিরপুর এলাকায় বসবাসকারী ওই ব্যক্তিই ঘটনার মূল দায়ী।
তবে সোহেলের এ বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে না পুলিশ। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির বলেন, তদন্তে ঘটনাস্থলে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ওসি বলেন, বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ, আলামত ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ঘটনার সময় সেখানে অন্য কোনো ব্যক্তি ছিল না। তার মতে, বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা এবং বিভ্রান্তি তৈরি করতেই সোহেল নতুন এ দাবি করছেন।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ীই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
গত ১৯ মে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি ভবন থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সেদিন সকালে রামিসা বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাকে পাশের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার মা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে মেয়ের স্যান্ডেল দেখতে পান। সন্দেহ হলে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। সেখানে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর স্বপ্না আক্তারকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় এবং পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ পাঁচ দিনের তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বর্তমানে মামলাটির বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে পরবর্তী ধাপ শুরু হবে।
রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার এ ঘটনায় এখনো দেশজুড়ে ক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
