বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানেও বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁয়ের পদ্মা হলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘লং লিভ বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। স্বাধীনতার পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চীন সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এ সম্পর্কের বিস্তৃতি ঘটেছে। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী চীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং অনেক উদ্যোক্তা চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আরও বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তিনি বলেন, চীনের আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। বিরোধী দলে থাকাকালেও বিএনপি চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। তবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চীনের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ স্থাপন এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে চীনের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও বাড়াতে চীন আন্তরিকভাবে আগ্রহী। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও সম্প্রসারণ করা হবে এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীন গঠনমূলক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভবিষ্যতে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক নান্নুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তাদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং এই সম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রতিফলিত হবে।
