মেঘনার পানি দিয়ে ঢাকার চাহিদা মেটাতে বড় পদক্ষেপ, বছর শেষে শুরু হতে পারে আংশিক সরবরাহ

রাজধানীর ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণে মেঘনা নদীর পানি শোধন করে সরবরাহের লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাবে।

সোমবার (৮ জুন) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার গন্ধর্বপুর এলাকায় ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই (ডিইএসডব্লিউএস)’ প্রকল্প পরিদর্শন শেষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি চালু হলে প্রথম ধাপে প্রতিদিন মেঘনা নদী থেকে সংগ্রহ করা ৫০ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করে রাজধানীতে সরবরাহ করা হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে আংশিক ও পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন হলে নিয়মিতভাবে ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে নগরবাসীর কাছে পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

পরিদর্শনের শুরুতে মন্ত্রী রূপসী এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সেজান পয়েন্টে স্থাপিত পানির উৎস পাইপলাইন এবং গন্ধর্বপুর শোধনাগারের বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখেন। এ সময় প্রকল্পের অগ্রগতি ও কারিগরি বিষয়গুলো সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম।

তিনি জানান, প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ সম্পন্ন হলে আরও ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে দুই ধাপ মিলিয়ে দৈনিক একশ’ কোটি লিটার পানি সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের ব্যয় ও অগ্রগতি সম্পর্কে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে একনেকের অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল। তবে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় ব্যয় ও সময়সীমা উভয়ই বৃদ্ধি পায়।

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মহানগরীর পানির প্রধান উৎস ছিল ভূগর্ভস্থ পানি। কিন্তু অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে মেঘনার পানি শোধন করে রাজধানীতে সরবরাহের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদীভিত্তিক উৎস ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানিসম্পদ সংরক্ষণও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মতিঝিল, পল্টন, ফকিরাপুল, উত্তরা, গুলশান, বনানী, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, বাড্ডা, মিরপুরসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা সরাসরি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন অঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যও বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে।

পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী, প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম (মুরাদ) এবং রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী প্রকল্পের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে নগরবাসীর সুস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং জবাবদিহির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।