বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে এবং সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি ও অপচয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। তিনি সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও জনকল্যাণকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানান।
জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেটের বড় অংশ ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা নেই। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণের কার্যকর পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়নি।
তার ভাষ্য, সরকার ব্যাংক খাত থেকে ব্যাপক ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হবে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যেতে পারে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জামায়াতের মতে, বাজেট বাস্তবায়নের পথে অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারের বাজেটের সঙ্গে জামায়াতের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের তুলনা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত ও বাস্তবভিত্তিক বাজেট প্রত্যাশা করলেও ঘোষিত বাজেটে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগের স্পষ্ট প্রতিফলন বাজেটে নেই। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং অর্থ লুটপাটের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতির কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাস্তবসম্মত মনে হয় না।
তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সে তুলনায় সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানায় জামায়াত। দলটির মতে, পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া এডিপির আকার বাড়ানো হলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে দলটি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, পরিচালন ব্যয় ও সুদ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা এবং বড় ঘাটতি অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তার মতে, সরকারের সামনে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আদায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের চাপ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা।
জামায়াতের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, তাদের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
এছাড়া জামায়াতের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাবও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বরভিত্তিক অর্থবছর চালু করা হলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সুবিধা হতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বন্ধের দাবি জানান এবং ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোতে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেন।
সবশেষে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট জনকল্যাণ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে বাজেট পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
