আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সংকট নতুন মোড়ে: লাইসেন্স বাতিলের বিরুদ্ধে রিট, শিক্ষার্থীদের বিকল্প প্রশিক্ষণের আশ্বাস

ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলকে কেন্দ্র করে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর সরকারের নেওয়া লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত এবার হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালটি বন্ধ থাকলেও আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের বিকল্প হাসপাতালে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। তিনি জানান, বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চে আবেদনটির শুনানি হতে পারে।

রিটে শুধু হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তই নয়, এ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত ১৯৮২ সালের ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স’-এর বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

গত ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে। একই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, তারা ৩০ দিনের মধ্যে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে।

ঈদের আগের দিন ২৭ মে সকালে হাসপাতালটির পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়ার্ডে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ থাকা, পর্যাপ্ত বিকল্প বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকা এবং বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়াই শিশুদের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাও সন্তোষজনক নয় বলে মন্তব্য করা হয়। এসব কারণেই লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এদিকে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের পর মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে সে বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।

সোমবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ করা হলেও আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা হয়নি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা অন্য হাসপাতালে প্র্যাক্টিস করতে পারবে। তাদের আরও হাসপাতাল আছে, সেখানে নিতে পারে। অমানবিক সেবার কারণে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরও কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইতোমধ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অন্য হাসপাতালে সংযুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন জানান, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজকে যে কোনো বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করতে হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের ওই হাসপাতালে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাবে এবং ফিরিয়ে আনবে।

তিনি বলেন, আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ কোন হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা করতে চায়, তা তিন কর্মদিবসের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন অনুযায়ী একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের তৃতীয় বর্ষ থেকেই হাসপাতালে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ শুরু হয় এবং পাসের পর এক বছরের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়।

অন্যদিকে একই অনুষ্ঠানে দেশের চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, হাম প্রতিরোধে পরিচালিত টিকাদান কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শতভাগেরও বেশি অর্জন হয়েছে।

তিনি বলেন, “টিকাদান আমরা বন্ধ করিনি। ঈদের আগেও প্রতিদিন টিকা দেওয়া হয়েছে, মাইকিং করা হয়েছে। ইপিআই কর্মসূচি চলমান রয়েছে।”

তবে এখনও হামে আক্রান্তের সংখ্যা ওঠানামা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, “হাম একেবারে শেষ হবে না। গত পরশু ৭০০ জন আক্রান্ত ছিল, আবার গতকাল তা ১ হাজারে উঠেছে। তবে গত এক সপ্তাহে হামে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য রয়েছে।”

ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এর আগে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তামাক মানুষের শরীরের প্রায় সব অঙ্গের ক্ষতি করে এবং এটি একটি মারাত্মক আসক্তি। তিনি জানান, ২০০৫ সালে প্রথম তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয় এবং বর্তমানে সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ কার্যকর করেছে।

নতুন আইনের আওতায় সব ধরনের গণমাধ্যম, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাটক, চলচ্চিত্র ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বিশ্বে ৭০ লাখের বেশি মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে প্রাণ হারান প্রায় ১৬ লাখ অধূমপায়ী, যাদের বড় অংশ নারী ও শিশু।

তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, পরিবেশ ও অর্থনীতির সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে সরকার ও সমাজের সব স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।