বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) উৎপন্ন হলেও এর মাত্র ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। বাকি ৯০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থাপিত হওয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৬ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছাবে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওয়াইডাব্লিউসিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে’ শীর্ষক জাতীয় জনসংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অধিকারভিত্তিক সংগঠন ভয়েস, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস (এপিসি)-এর সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সংলাপে উপস্থাপিত ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১’-এর বাস্তবায়ন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। নিরাপদ সংগ্রহ, পরিবহন, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশসম্মত নিষ্পত্তি এবং উৎপাদকের বর্ধিত দায়বদ্ধতা (ইপিআর) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, টেকসই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ই-বর্জ্যের পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপদ পুনর্ব্যবহার, গবেষণা, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং সরকার, শিল্প ও অনানুষ্ঠানিক খাতের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পরামর্শক তড়িৎ কান্তি বিশ্বাস বলেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন বা সচেতনতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। কার্যকর অবকাঠামো, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা ছাড়া ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হবে না।
অনুষ্ঠানে ভয়েসের উপপরিচালক মুশাররাত মাহেরা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্র, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের ঘাটতি তুলে ধরে উৎপাদকের বর্ধিত দায়বদ্ধতা (ইপিআর) কার্যকর করা, নিবন্ধিত রিসাইক্লিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তদারকি জোরদারের সুপারিশ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রচারণা ও কর্মশালার মাধ্যমে তরুণদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
জনসংলাপে নাগরিক উদ্যোগ, ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বিভিন্ন রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান, গবেষক এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কার্যকর মনিটরিং, সমন্বিত জাতীয় নীতির বাস্তবায়ন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার করা গেলে ই-বর্জ্য পরিবেশের জন্য হুমকি না হয়ে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে।
