নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে নিয়ন্ত্রণের নামে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা সংকটে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়লে কোনো সরকারই জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে পারবে না।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে এসব কথা বলেন সংগঠনটির নেতারা।
তাদের অভিযোগ, ব্যাটারিচালিত যানবাহন খাতের প্রকৃত সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সরকার এমন কিছু নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে, যার সুবিধা বৃহৎ পুঁজির মালিকরা পাবে। এতে একদিকে শ্রমিকদের জীবিকা সংকট বাড়বে, অন্যদিকে নগরজীবনে জনদুর্ভোগও আরও তীব্র হতে পারে।
সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংকট সমাধানে প্রথমে এ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং তাদের বিনিয়োগ করা ক্ষুদ্র পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সড়ক ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে যৌক্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে সমাবেশে সংগঠনের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা জলি তালুকদার, সহসভাপতি সুমন মৃধা ও মো. নুরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম মাইজভান্ডারি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম, দপ্তর সম্পাদক রিপন হোসেন, ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. হাসান এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কামাল হোসেন বক্তব্য দেন।
‘বিগত সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা চলছে’
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, সরকারের বিভিন্ন নীতি ও দুর্নীতির কারণে দেশের সাধারণ মানুষ সংকটে পড়েছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির দায় প্রকৃত দায়ীদের ওপর না দিয়ে শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, বর্তমান সরকারও আগের সরকারের দেখানো পথেই এগোচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিবর্তে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার পেছনে কর্মসংস্থানের অভাব ও মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন বড় কারণ হলেও এ বিষয়টি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
শ্রমিক নেতারা আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বন্ধ করে সেগুলো ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক নতুন শিল্প গড়ে তোলা, বন্ধ সরকারি কারখানা আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
যানজটের দায় শুধু রিকশার ওপর নয়
বক্তারা বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে যানজট তৈরি হচ্ছে। এর পুরো দায় রিকশাচালকদের ওপর চাপিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তাদের মতে, যানজট কমাতে দীর্ঘমেয়াদি ও মানবিক নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব শ্রেণির মানুষের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করে বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
ব্যাটারিচালিত যানবাহনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন শ্রমিক নেতারা। তাদের দাবি, এ খাত শুধু বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি এ খাত থেকে অর্থনীতিতে আসা অবদানও নীতিনির্ধারণের সময় বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
অবৈধ সংযোগের দায় কার, প্রশ্ন শ্রমিক নেতাদের
শ্রমিক নেতারা বলেন, কোনো এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে তা শনাক্ত করে বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের। এ কাজের জন্য সরকারি অর্থে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়।
তাদের দাবি, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকরা প্রতিদিন গ্যারেজ মালিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য অর্থ দেন। সেই অর্থ সরকারি রাজস্বে যথাযথভাবে জমা না হওয়ার পেছনে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
‘বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে নীতিমালা করা হচ্ছে’
শ্রমিকদের নিরাপদ জীবিকা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে সড়ক উপযোগী নকশায় আধুনিকায়ন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া এবং সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগের আড়ালে অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ফিটনেস সার্টিফিকেট ও সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাবের মাধ্যমে বৃহৎ পুঁজির মালিকদের কারখানায় তৈরি যানবাহন কিনতে শ্রমিকদের বাধ্য করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
তাদের মতে, এ ধরনের নীতিমালা চালু হলে বিদ্যমান সংকট আরও বাড়তে পারে।
১২ দফা দাবি
সমাবেশ থেকে ব্যাটারিচালিত যানবাহন খাতের সংকট নিরসনে ১২ দফা দাবি তুলে ধরে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সড়কের উপযোগী নকশায় ব্যাটারিচালিত যানবাহন আধুনিকায়ন করে বিআরটিএর মাধ্যমে লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দেওয়া এবং চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া সব অংশীজনের অংশগ্রহণে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নামে বৈধ মিটারের সংযোগ না কাটার দাবি জানানো হয়।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন, সড়কের লেন পদ্ধতি কার্যকর করা, সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণের দাবিও রয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ে করা সব রিট দ্রুত নিষ্পত্তি, শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনা, অসাধু বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং শ্রমিকদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালুর দাবিও তুলে ধরেন নেতারা।
তারা আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনে শ্রমিকদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে হবে। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মানুষকে প্যাডেলচালিত বাহনে অতিরিক্ত শারীরিক শ্রম থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সমাবেশ শেষে শ্রমিকরা লাল পতাকা নিয়ে একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
