একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম, চিকিৎসা ব্যয়ে দিশেহারা নোয়াখালীর দম্পতি

একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্মের আনন্দের মধ্যেও চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার মোস্তাকিম হোসেন ও সামরিনা আক্তার দম্পতির। সময়ের আগেই জন্ম নেওয়ায় পাঁচ নবজাতকই শারীরিকভাবে দুর্বল। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) এবং বাকি দুজন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

দুই বছর আগে বিয়ে হয় মোস্তাকিম ও সামরিনার। গর্ভধারণের তিন মাস পর আলট্রাসনোগ্রামে জানা যায়, সামরিনার গর্ভে ছয়টি ভ্রূণ রয়েছে। চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই বিষয়টিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে পাঁচটি ভ্রূণ টিকে থাকে।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম দেন সামরিনা। নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম হওয়ায় শিশুদের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। প্রতিটি শিশুর ওজন প্রায় এক কেজির কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সামরিনা বলেন, “সন্তানদের জন্ম দিতে পেরে আমি খুশি। কিন্তু ওরা সবাই এনআইসিইউতে আছে। ওদের সুস্থতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে।”

তিনি জানান, চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে বলেছেন, শিশুদের অন্তত এক মাস নিবিড় পরিচর্যায় রাখতে হতে পারে। দীর্ঘ সময়ের এই চিকিৎসার ব্যয় কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

সামরিনা আরও জানান, তিনি নোয়াখালীর জয়াগ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গর্ভধারণের কারণে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “গর্ভধারণের মাত্র ৩০ সপ্তাহে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে হয়েছে। নবজাতকদের ওজন এক কেজিরও কম। এজন্য তাদের বিশেষ পরিচর্যায় রাখা হয়েছে।”

তিনি বলেন, একসঙ্গে তিন সন্তানের জন্মের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও পাঁচ সন্তানের জন্ম অত্যন্ত বিরল। গত কয়েক বছরে ঢাকা মেডিকেলে এমন ঘটনা হাতে গোনা কয়েকবার ঘটেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঢাকা মেডিকেলের এনআইসিইউতে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় পাঁচ শিশুর মধ্যে মাত্র তিনজনকে সেখানে রাখা সম্ভব হয়েছে। অন্য দুই শিশুকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

গর্ভাবস্থার পুরো সময়টাই ছিল সামরিনার জন্য কঠিন। একাধিক সন্তান ধারণের কারণে শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে। অধিকাংশ সময় বিশ্রামে থাকতে হয়েছে তাঁকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য কয়েক মাস আগে নোয়াখালী থেকে ঢাকায় চলে আসেন তাঁরা।

মোস্তাকিম হোসেন জানান, স্ত্রী ও সন্তানদের চিকিৎসার পেছনে ইতোমধ্যে প্রায় সাত লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। খরচ মেটাতে নিজের ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান বিক্রি করতে হয়েছে। পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকেও আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা দুই শিশুর চিকিৎসা ব্যয় প্রতিদিনই বাড়ছে। তারপরও সন্তানদের সুস্থ করে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়াই এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”

এদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় তারা সহযোগিতা করছেন।

সব অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও আশাবাদী এই দম্পতি। তাঁদের বিশ্বাস, সবার দোয়া ও সহযোগিতায় পাঁচ সন্তানই সুস্থ হয়ে একদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে।