অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন সরকারের জন্য ‘আত্মঘাতী’ হবে: টিআইবি

জনগণের ওপর সরকারনিয়ন্ত্রিত ও অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন চাপিয়ে দেওয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই ‘আত্মঘাতী’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবের মাধ্যমে দুর্বল করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক প্রভাব ক্ষমতাসীনদের ওপরই ফিরে আসে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬: হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবির পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক অধিপরামর্শ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় খসড়া আইনের ওপর ১৯টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে, তারা মূলত নিজেদের জন্যই ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ তৈরি করে। কারণ ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী নয়। আজ রাজনৈতিক প্রভাবে যে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা হবে, ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক পরিণতি বর্তমানের ক্ষমতাসীনদেরই ভোগ করতে হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী রাষ্ট্রেও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে দলীয়করণ ও অকার্যকর করার নজির খুবই কম। বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে, যা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বর্তমান খসড়া অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন সম্ভব হবে না।

সংস্থাটির মতে, খসড়া আইনের ১৩ নম্বর ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার গোপন আটককেন্দ্র, অর্থাৎ কথিত ‘আয়না ঘর’ পরিদর্শনের বিষয়ে কমিশনের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে গোপন ও অবৈধ আটকের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এ ছাড়া ২০ নম্বর ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। টিআইবির মতে, এ বিধান বহাল থাকলে কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে না এবং এর কার্যকর ভূমিকা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

সরকারের ভেতরে পরিবর্তনবিরোধী একটি শক্তি সক্রিয় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এই প্রতিরোধ শুধু রাজনৈতিক নয়, অনেক ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র আরও বেশি প্রভাবশালী। মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়ায় সেই আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

সভায় বক্তারা বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্রসংস্কার কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘জুলাই সনদ’-এ থাকা অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন সম্ভব।

টিআইবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, খসড়া আইনের বিষয়ে দেওয়া ১৯টি সুপারিশ সরকার বাস্তবায়ন না করলে স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

সভায় টিআইবি ও এইচআরএফবির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার একটি স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক মানবাধিকার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেবে বলেই তারা আশা প্রকাশ করেন।