লঘুচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা, জুলাই-আগস্টে বন্যা ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর প্রভাবে আগামী রোববার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। একই সময়ে উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জুলাই ও আগস্ট মাসে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন উত্তর ওডিশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপটি বর্তমানে একই এলাকায় অবস্থান করছে এবং এটি আরও ঘনীভূত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার মতো কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা বলেন, লঘুচাপটি নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। এটি শক্তিশালী হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়বে। আগামী শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই কিছু এলাকায় বৃষ্টি শুরু হতে পারে এবং রোববার থেকে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি জানান, লঘুচাপটি নিম্নচাপে পরিণত হলে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি থাকবে। পাশাপাশি ঢাকা, দেশের মধ্যাঞ্চল এবং অন্যান্য এলাকাতেও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, লঘুচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর, তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে, কারণ সাগর উত্তাল থাকতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, জলবায়ুগত কারণে বর্ষা মৌসুমের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সব সময়ই বন্যার ঝুঁকি থাকে। উজান ও দেশের প্রধান নদী অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানির স্তর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সে কারণে চলতি বছর ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সারদার উদয় রায়হান বলেন, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ নদী অববাহিকার জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে উপকূলীয় নদীগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন দিন আগে পূর্বাভাস দেওয়া যায়।

বন্যা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানির স্তর কিছুটা কমলেও আগামী চার দিনে তা আবার বাড়তে পারে এবং পঞ্চম দিনে স্থিতিশীল থাকতে পারে।

আগামী ৪ থেকে ৭ জুলাই কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগামী পাঁচ দিনে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির স্তর বাড়লেও তা বিপৎসীমার নিচেই থাকবে। এছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা নদ-নদীর পানি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে। ফলে ওই অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে নীলফামারীর ডালিয়া ও লালমনিরহাটের তারাপুর পয়েন্টে তিস্তা নদী, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলিতে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি নিজ নিজ সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।

সারদার উদয় রায়হান বলেন, বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত রয়েছে। তবে আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আগামী কয়েক দিন মেঘনা অববাহিকার পরিস্থিতিও স্বাভাবিক থাকতে পারে।

তিনি আরও জানান, চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সদ্য বিদায়ী জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে জুলাই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ মাসে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের কোথাও কোথাও তাপপ্রবাহও বয়ে যেতে পারে।

ঐতিহাসিকভাবে বর্ষা মৌসুমের এই সময়েই দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলো হয়েছে। ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এছাড়া ২০০৪ সালে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর উচ্চপ্রবাহ একসঙ্গে মিলিত হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়। ২০২২ ও ২০২৪ সালের বড় বন্যায় সম্মিলিতভাবে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে ক্রমবর্ধমান অতিবৃষ্টির কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।