বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মননচর্চার অগ্রপথিক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক, সমাজ বিশ্লেষক এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রোববার রাজধানীর মিরপুরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। জানা গেছে, রোববার বেলা আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের একটি রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণের সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবার মুখে আটকে যাওয়ার পর তাঁকে দ্রুত নিকটস্থ একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর একই বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রায় চার দশক ধরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং পরে বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজভাবনা নিয়ে তাঁর ছিল বিস্তৃত গবেষণা ও লেখালেখি। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘নৈতিকতা: শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি’, ‘যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা’, ‘মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব’, ‘আশা-আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে’, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, ‘অবক্ষয় ও উত্তরণ’, ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি: সম্ভাবনার নবদিগন্ত’, ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’, ‘উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাংলা সাহিত্য’, ‘বাংলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য’, ‘সাহিত্যচিন্তা’, ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’ এবং ‘আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা’। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও **‘স্বদেশচিন্তা’**সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এছাড়া তিনি ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেছেন এবং নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখেছেন।

তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন এবং বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থ সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা ও সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষা ও মননচর্চায় বিশেষ অবদান রেখে গেছে।

সাহিত্য ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁকে বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলা একাডেমিকে একটি সত্যিকার জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। তাঁর ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গি হামলায় তিনি নিহত হন। তাঁর মেয়ে শুচিতা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, গবেষণা ও সমাজচিন্তায় তাঁর অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।