রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যখাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বারোপ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে রোগ নির্ণয় আরও সহজ, দ্রুত ও নির্ভুল হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ও সম্ভব।
রোববার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা সীমিত সম্পদ নিয়েও যুগোপযোগী ও কার্যকর স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষমতা রাখেন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনকে আরও উৎসাহিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দেশীয় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে। বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব হবে। এতে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যাবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। স্বাস্থ্যখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে রোগ নির্ণয় আরও সহজ, দ্রুত ও নির্ভুল হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের কিছু হাসপাতালে এক কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের ধৈর্য, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিমেডিসিন কার্যক্রমের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, এ প্ল্যাটফর্মে অনলাইন বারো-লিড হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক পরীক্ষা এবং ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কোপের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে। সরকারের নতুন গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সঙ্গে এসব প্রযুক্তির সমন্বয় করা গেলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের প্রয়োগ। তিনি বলেন, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও টেকসই স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল পদার্থবিদ্যা ও প্রযুক্তি বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও মৌলিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে। দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে দূরবর্তী চিকিৎসাসেবা, ডায়াবেটিক পায়ের পরিচর্যা, নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ নির্ণয় প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেন। সম্মেলনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল পদার্থবিদ্যা ও প্রযুক্তি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়া বুয়েটের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তৌফিক হাসান স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং এ খাতে উদ্যোক্তা তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এফ এম সিদ্দিকী, জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ এবং যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক বি এইচ ব্রাউন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল পদার্থবিদ্যা ও প্রযুক্তি বিভাগ, বুয়েটের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাইবিট লিমিটেড এবং রিলেভেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সোসাইটি যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করছেন। বিভিন্ন কারিগরি অধিবেশনে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ, শিশুদের স্নায়বিক বিকাশ, শরীরে পানিশূন্যতা প্রতিরোধে মুখে খাওয়ার লবণ-চিনির দ্রবণ কর্মসূচি, চোখের শুষ্কতার চিকিৎসা, ডায়াবেটিক পায়ের ক্ষত প্রতিরোধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, বৈদ্যুতিক জৈব প্রতিবন্ধকতা প্রযুক্তি, স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে বৈষম্য কমাতে দুটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ক্যানসার চিকিৎসা, উপশমমূলক চিকিৎসাসেবা, হাসপাতালজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধ, স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে একাধিক কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
