সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত জমির উদ্দিন সরকার

  • জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে দাফন, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সর্বস্তরে শোক

জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৮ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানও এ তথ্য জানান।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে উজ্জ্বল কর্মজীবন

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।

জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালেই বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। পরে আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, পরে শিক্ষামন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদি বিএনপি সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী থাকাকালে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান যুক্ত হয়।

শিক্ষা, আইন ও রাজনৈতিক জীবন

১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল হন। দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

ছাত্রজীবনে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় হাইকোর্ট আইনজীবীদের অন্যতম ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে জাগদলে যোগ দেন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।

দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতা

১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জমির উদ্দিন সরকার। এরপর ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পঞ্চগড়-১ এবং ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

লেখক হিসেবেও পরিচিত

আইন, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান, লন্ডনে শিক্ষা জীবন, লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি, পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন, দি ল অব দি সি এবং ল অব দি ইন্টারন্যাশনাল রিভারস অ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্স।

জানাজা ও দাফন

সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।  জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের জাতীয় কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে বাদ জোহর রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাজা হয়। পরে বাদ আসর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দ্বিতীয় জানাজা হয়।

দ্বিতীয় জানাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীরবিক্রম), বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আইনজীবী, আত্মীয়স্বজন ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে মরহুমের মরদেহ নিজ জেলা পঞ্চগড়ে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সংসদ ভবন চত্বরে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জানাজা শেষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং পরে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়

রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শোকবার্তায় তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত করা, সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, বিচারিক ও আইন অঙ্গনের ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করেছেন।

সুপ্রিম কোর্টে আধাবেলা বন্ধ, বিএনপির শোক কর্মসূচি

তাঁর মৃত্যুতে রোববার সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের কার্যক্রম দিনের দ্বিতীয় ভাগে বন্ধ রাখা হয়েছে। আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্টের কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে।

এদিকে সোমবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ সারাদেশে একদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে দলীয় কার্যালয়গুলোতে কালো পতাকা উত্তোলন এবং নেতাকর্মীদের কালো ব্যাজ ধারণ করা হবে।