এক দাদির ত্যাগে গড়া লামিন ইয়ামালের বিশ্বজয়ের গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক

ফুটবল বিশ্বে এখন আলোচনার অন্যতম নাম লামিন ইয়ামাল। বয়স মাত্র ১৭ পেরিয়েছে, অথচ এরই মধ্যে ইউরোপের সেরা মঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই তরুণ ফুটবলার। অসাধারণ ড্রিবলিং, গতি ও মাঠের বুদ্ধিমত্তায় তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতিভায়।

তবে ইয়ামালের এই সাফল্যের গল্প শুধু ফুটবল প্রতিভার নয়। এর পেছনে রয়েছে এক অভিবাসী পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম, এক দাদির আত্মত্যাগ এবং কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্ন পূরণের এক অনন্য ইতিহাস।

মরক্কো থেকে স্পেনে দাদির সংগ্রাম

লামিন ইয়ামালের দাদি ফাতিমা রোমানি উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো থেকে উত্তর স্পেনের কাটালোনিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করা।

নতুন দেশে শুরুটা সহজ ছিল না। সীমিত সুযোগ, কঠিন জীবনযাপন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ফাতিমা নিজের পরিবারকে আগলে রেখেছেন। দিনের পর দিন পরিশ্রম করে তিনি সন্তানদের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করেন।

ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর নাগরিক এবং মা শিলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির বাসিন্দা। পারিবারিক সূত্রে ইয়ামালের পুরো নাম লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা।

কঠিন শৈশব থেকে ফুটবলের পথে

ছোটবেলাতেই ইয়ামালের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর তার শৈশব কাটে রোক্যাফোন্দা এবং গ্রানোয়ের্স এলাকার মধ্যে যাতায়াত করে।

রোক্যাফোন্দা ছিল অভিবাসী অধ্যুষিত এবং তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকা। অনেকের চোখে অবহেলিত এই জায়গাই হয়ে ওঠে ইয়ামালের স্বপ্নের শুরু।

পরিবারের কঠিন সময়গুলোতে দাদি ফাতিমাই ইয়ামালের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন। তিনি তাকে সঠিক পথে থাকতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছেন।

ছয় মাসের ইয়ামাল ও মেসির ঐতিহাসিক ছবি

২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা, যা বহু বছর পর বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

ইউনিসেফ ও দিয়ারিও স্পোর্ট-এর একটি দাতব্য ফটোশুটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান ইয়ামালের মা শিলা। তখন মাত্র ২০ বছর বয়সী বার্সেলোনার তরুণ তারকা লিওনেল মেসির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ হয়।

সেই ছবিতে দেখা যায়, ছয় মাস বয়সী শিশু লামিন ইয়ামালকে একটি প্লাস্টিকের টবে গোসল করাচ্ছেন মেসি।

২০২৪ সালের ইউরো প্রতিযোগিতার সময় ইয়ামালের বাবা মুনির ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে লেখেন, “দুই কিংবদন্তির শুরু”।

ছবিটি প্রকাশের পর ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। অনেকেই মজা করে বলেন, হয়তো মেসি অজান্তেই নিজের ফুটবল জাদুর কিছুটা সেই শিশুর মধ্যে দিয়ে দিয়েছিলেন।

লা মাসিয়ার প্রতিভা থেকে বার্সেলোনার তারকা

মাত্র সাত বছর বয়সে রোক্যাফোন্দার স্থানীয় ক্লাবে খেলার সময় বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি লা মাসিয়ার স্কাউটদের নজরে পড়েন ইয়ামাল।

তার অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা এবং ফুটবল বোঝার ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে বার্সেলোনা তাকে একাডেমিতে যুক্ত করে।

এরপর বয়সভিত্তিক দলের ধাপগুলো খুব দ্রুত অতিক্রম করেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৯ এপ্রিল, মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় তার। এর মাধ্যমে ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে রেকর্ড গড়েন তিনি।

ইউরোতে বিশ্বকে চমকে দেওয়া ইয়ামাল

২০২৪ সালের ইউরো ফুটবল প্রতিযোগিতায় ইয়ামাল নিজের প্রতিভার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দেন।

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তার অসাধারণ বাঁকানো শটে করা গোলটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে ওঠে। ওই গোলের মাধ্যমে তিনি ইউরোর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ৩৬২ দিন।

এরপর ১৭তম জন্মদিনের ঠিক একদিন পর স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪-এর ট্রফি হাতে তুলে নেন ইয়ামাল। পাশাপাশি নির্বাচিত হন টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়।

‘৩০৪’ সংখ্যায় নিজের শেকড়ের পরিচয়

লামিন ইয়ামালের সবচেয়ে পরিচিত গোল উদযাপন হলো হাতের আঙুল দিয়ে ‘৩-০-৪’ চিহ্ন তৈরি করা।

এই সংখ্যা মূলত রোক্যাফোন্দা এলাকার পোস্টাল কোডের সঙ্গে সম্পর্কিত। যে এলাকাকে একসময় অনেকেই অবহেলার চোখে দেখত, সেই এলাকার পরিচয়ই এখন বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন ইয়ামাল।

তার বুটেও স্পেন ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনির পতাকার পাশাপাশি ‘৩০৪’ লেখা থাকে।

সাফল্যের পরও ভুলে যাননি পরিবারকে

বিশ্বখ্যাত ফুটবলার হওয়ার পরও নিজের শেকড় ভুলে যাননি ইয়ামাল। নিজের উপার্জন দিয়ে পরিবারের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু ট্রফি বা খ্যাতি নয়, বরং সেই মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানো, যারা তার কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন।

এমনকি ইউরো ২০২৪ চলাকালীন ব্যস্ততার মধ্যেও হোটেল কক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি এবং নিজের স্কুলিং শেষ করার খবরও পেয়েছেন।

লামিন ইয়ামালের গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের উত্থানের গল্প নয়। এটি একজন দাদির ত্যাগ, একটি পরিবারের সংগ্রাম এবং একজন তরুণের অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প।

রোক্যাফোন্দার ছোট্ট এলাকা থেকে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে উঠে আসা ইয়ামাল প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন বড় হলে এবং পরিশ্রম অব্যাহত থাকলে কঠিন বাস্তবতাকেও জয় করা সম্ভব।