কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার সীমিত সরবরাহের মাধ্যমে জরুরি ও অগ্রাধিকার খাতে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ফলে জ্বালানি নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কে যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকে।
বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। তবে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে সরবরাহ আরও প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে।
মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এসব টার্মিনাল থেকে গড়ে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। বর্তমানে কারিগরি সমস্যার কারণে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতার কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি একনেক সভায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় তিনটি কূপ খনন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের ভবিষ্যৎ গ্যাস চাহিদা পূরণে চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে মালয়েশিয়া থেকে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস দেশের মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য রি-গ্যাসিফিকেশন ও পাইপলাইন পরিবহন ব্যবস্থার বিষয়েও কাজ চলছে।
দেশের স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে নতুন অনশোর ও অফশোর মডেল পিএসসির আওতায় বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আবাসিক ও শিল্প খাতে দুর্ভোগ
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্নায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে সমস্যায় পড়েছে। শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাময়িক অসুবিধায় দুঃখ প্রকাশ
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন ও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তাই দীর্ঘদিনের সংকটের স্থায়ী সমাধান দ্রুত সম্ভব নয়।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা দ্রুত সমাধানে কাজ করছেন। সাময়িক এই অসুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক এলএনজি ও এলপিজি বাজার আরও অস্থিতিশীল হতে পারে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
