রাজধানীর চারপাশের নদী ও খালগুলোকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে নতুন করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বুড়িগঙ্গাসহ আশপাশের নদীগুলোর পরিবেশ পুনরুদ্ধারে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, আন্তঃসংস্থা কমিটি গঠন এবং নদী ও খালপাড় রক্ষায় পরিবেশবান্ধব ‘বিন্না ঘাস’ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগও আগের পরিকল্পনাগুলোর মতো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন’ শীর্ষক বৈঠকে রাজধানীসংলগ্ন বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এবং অন্যান্য নদীর বর্তমান অবস্থা, দূষণের উৎস ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, খালের নাব্যতা কমে যাওয়া এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে নদী দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
তিনি শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকর রাখার ওপর জোর দিলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ম না মেনে বর্জ্য ফেললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম। ফলে বাস্তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতেও বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল প্রকট। তাই নতুন কমিটির চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।
পরিবেশকর্মী ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, নদী রক্ষায় সবচেয়ে বড় সমস্যা পরিকল্পনার অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতা। সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরাই যদি নদী দখল বা দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন কমিটি গঠন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
একই দিনে পৃথক আরেকটি সভায় নদী ও খালপাড় সংরক্ষণে কংক্রিট ব্লকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ‘বিন্না ঘাস’ ব্যবহারের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন বুয়েটের উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ শরিফুল ইসলাম। তবে প্রকৌশলীদের একাংশের মতে, বড় নদীর তীব্র ভাঙন ঠেকাতে শুধু ঘাস ব্যবহার যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
সভায় নদীদূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অভিযান পরিচালনার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান আবার আগের মতোই নদীতে বর্জ্য ফেলতে শুরু করে। বিশেষ করে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী নদীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, নদী রক্ষায় পরিকল্পনা ও বৈঠকের চেয়ে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনই হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
