চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্বে মানবিকতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

  •  স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল, মানবিক ও সেবামুখী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে ড্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের আগে তাঁরা জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে নিম ও অর্জুন গাছের চারা রোপণ করেন। পরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

বক্তব্যের শুরুতে চিকিৎসকদের সামনে চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে অচিকিৎসক ও উদ্ভাবক টমাস এডিসনের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে রোগের কারণ, প্রতিরোধ, মানবদেহের যত্ন এবং খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধারণার সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মিল রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে মানুষকে রোগের উৎপত্তি, কারণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে আগেই সচেতন করা। এ জন্য বিদ্যমান চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সচেতন করবেন এবং তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে।

চিকিৎসকদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেহেতু সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রায় সব কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে, তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের নিজ নিজ মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত থাকা অযৌক্তিক নয়। তবে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমাবেশে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবের বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছরে উন্নীত করা, চিকিৎসকদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা এবং চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।

এ ছাড়া উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা, বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক চিকিৎসকের জন্য সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতন কাঠামো এবং রাজধানীর বাইরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব প্রস্তাব অযৌক্তিক নয়। এরই মধ্যে শিশু হাসপাতালসহ ঢাকার বাইরে বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। চিকিৎসকদের অন্যান্য প্রস্তাবও ইতিবাচকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে।

সরকার একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র, দুর্বল অর্থনীতি এবং বিভাজিত প্রশাসনের পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সরকার দেশকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শাসন ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা এখনও সক্রিয় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি চক্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার জন্য সুকৌশলে সক্রিয় হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানিসহ প্রতিটি খাতকে স্বনির্ভর ও কার্যকর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকলেও অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা শৈথিল্য সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করতে পারে।

এ কারণে চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না হয়, সে লক্ষ্যে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ চিকিৎসক সমাবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগঠনটির নেতাকর্মী ও চিকিৎসকেরা অংশ নেন।