বাংলাদেশের জনমিতি বুঝতে অভিবাসী রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি প্রযোজ্য নয়: তথ্যমন্ত্রী

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো অভিবাসী রাষ্ট্রগুলোর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের জনমিতি ও জাতিসত্তা গঠনের ইতিহাসের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তার মতে, অভিবাসী রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জনমিতি বা জাতিসত্তার বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা সঠিক হবে না।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ঢাকার একটি হোটেলে ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন’ আয়োজিত ‘ইন্ডিজেনাস আইডেন্টিটি ইজ ইরেলেভেন্ট ফর বাংলাদেশ (বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক)’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের জাতিসত্তা কোনো বহিরাগত জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ বা তাদের ভূমি দখলের ধারায় গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ সময় ধরে নৃতাত্ত্বিক বিবর্তন, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এ দেশের জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটেছে।

তিনি বলেন, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড অঞ্চলের অভিবাসী রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাসে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের ঘটনা রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার দায় মোকাবিলায় এসব দেশে বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস ও জনমিতির সঙ্গে ওই অভিজ্ঞতার সরাসরি তুলনা করা যায় না।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা বা মতামত দেওয়ার সময় এমন কোনো শব্দ বা বয়ানকে জনপ্রিয় করা উচিত নয়, যা দেশের বাস্তবতায় অপ্রাসঙ্গিক। কোনো নির্দিষ্ট ধারণাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা বয়ানে অনিচ্ছাকৃতভাবে যুক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে একক কোনো নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, হাজার বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে এ দেশের সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বিকাশ ঘটেছে।

বাংলাদেশের জনমিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নিজস্ব ইতিহাস ও নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, অন্য দেশের অভিজ্ঞতার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে না।

তিনি আরও বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সমস্যা পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এসব বিষয় বিশ্লেষণের সময় সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ও সংশ্লিষ্ট গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নাগরিকত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নাগরিকত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। তার মতে, এই ধারণা দেশের বিভিন্ন বৈচিত্র্য ও সংকটকে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস, জনমিতি ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে বক্তব্য ও বয়ান নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সঠিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব এবং ভুল উত্তর হলে তা সংশোধন করা যায়। তবে প্রশ্নের ভিত্তিই যদি ভুল হয়, তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নিজেকে যুক্ত না করাই শ্রেয়।

চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেহেদী হাসান পলাশের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি গবেষক, শিক্ষক, নৃতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।