বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। ঢাকায় চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে চীন অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে দুই দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং। এর মাধ্যমে দুই দেশ ও জনগণের বড় ধরনের উপকার হবে বলেও বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়ার প্রায় চার সপ্তাহ পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
সাড়ে তিন দশক পর এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে সরাসরি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ চলে।
ত্রয়োদশ সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনে রয়েছেন ৫০ জন সংসদ সদস্য। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য সংসদ সদস্য ছিলেন ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি।
দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটদানের নিয়ম ও নির্দেশনা তুলে ধরেন।
শুরুতে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল ভোট দেন। পরে সংসদ নেতা তারেক রহমান বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে ভোট দেন। এরপর মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দুপুর ২টা ১৯ মিনিটে ভোট দেন। ব্যালট পেপার জমা দেওয়ার জন্য তিনটি বাক্স রাখা হয়েছিল।
ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। ফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাঁড়িয়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং তার হাতে লাল গোলাপ তুলে দিয়ে অভিনন্দন জানান।
নির্বাচনের শুরুর আনুষ্ঠানিকতা বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
তৃণমূল রাজনীতি থেকে বঙ্গভবন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘ এবং নানা চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে এসে ধীরে ধীরে তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে জায়গা করে নেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে বিএনপির নানা সংকট, দমন-পীড়ন ও আন্দোলনের মধ্যে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। পরে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে কারাগারেও যেতে হয়।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেছেন তিনি।
১৯৭৯ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। মা ছিলেন মির্জা ফাতেমা আমিন।
বাবার রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করলেও জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের প্রথম দিকের সম্পৃক্ততা ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের সঙ্গে। পরে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে চলে আসেন।
১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। দুই বছর পর তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন এবং দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ধাপে ধাপে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের পর্যায়ে উঠে আসেন।
২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
আন্দোলনে দলের নেতৃত্ব
এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির কঠিন সময়েও মির্জা ফখরুল দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন, মামলা ও গ্রেপ্তারের মধ্যে তিনি মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে সক্রিয়তা কমিয়ে দিলে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৮ সালে লন্ডনে চলে যাওয়ার পর দেশের ভেতরে দলের কার্যক্রমে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনেও তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে। দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে দলকে সংগঠিত রাখা এবং আন্দোলনের মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তিনি কৃষি ও বিমান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন তিনি। বগুড়া-৬ থেকে নির্বাচিত হলেও সারাদেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে সংসদে যোগ দেননি। ঘটনাটি সংসদীয় রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী হিসেবে আলোচিত হয়।
পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটি তার জন্য নির্ধারিত ছিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা পর্যায় পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা রাহাত আরা একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তাদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ।
