চাকরি হারিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ, মোতায়েন পুলিশ
- নিজস্ব প্রতিবেদক
গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের ৬২৭ শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবলকে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে কারখানার প্রধান ফটকে টানানো ছাঁটাইয়ের তালিকা দেখতে ভিড় করেন শ্রমিকেরা। এ সময় তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা দেখা যায়।
চার প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ছাঁটাই
ছাঁটাই হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন এবং কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কারখানার প্রধান ফটকে কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর করা ছাঁটাই-সংক্রান্ত নোটিশ সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে শ্রমিকেরা সেখানে গিয়ে নিজেদের নামের তালিকা দেখেন।
অনেক শ্রমিক তালিকায় নিজেদের নাম দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারানোর ঘটনায় তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং জটিলতা ও গ্যাসসংকটের কথা জানাল কর্তৃপক্ষ
কারখানা কর্তৃপক্ষের নোটিশে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা এবং গ্যাস বিল পরিশোধ করতে না পারায় গত ৬ জুন থেকে কারখানাগুলো লে-অফে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় লে-অফের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, গ্যাস বিল পরিশোধ না করায় কারখানার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকায় উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন সেকশন, বিভাগ ও ডিভিশনের কিছু পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর ছাঁটাই
কর্তৃপক্ষের নোটিশ অনুযায়ী, শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০ ধারা অনুসারে কারখানার অতিরিক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনানুগ সব পাওনা পরিশোধ করার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের সব পাওনা পরিশোধ করা হবে।
‘চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব’
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের একজন স্বপ্না বেগম কেয়া গ্রুপের সুইং সেকশনে অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই কারখানায় কাজ করে আসছেন। এখন চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, সেটিই তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।
সুইং সেকশনের আরেক অপারেটর নজরুল ইসলাম প্রায় ১০ বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করার কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন চাকরি পাওয়াও কঠিন। চাকরি চলে যাওয়ায় তিনি এখন নিরুপায় হয়ে পড়েছেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন কোনো চাকরি না পেলে জীবিকা নির্বাহের জন্য অটোরিকশা চালানো ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ থাকবে না।
দক্ষ শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগে অগ্রাধিকার
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কারখানায় নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২১ ধারা অনুযায়ী বর্তমানে ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এ ছাড়া যেসব শ্রমিক ও কর্মচারীর চাকরি এখনো বহাল রয়েছে, তারা লে-অফের আওতায় থাকবেন এবং আইন অনুযায়ী লে-অফের সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন
ছাঁটাইয়ের ঘটনায় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কারখানার প্রধান ফটকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিক ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না ঘটে, সে জন্য কারখানার প্রধান ফটকে শিল্প পুলিশের পাশাপাশি গাজীপুর মহানগর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি জানান, শ্রমিকদের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারিতে রেখেছে।
এদিকে হঠাৎ করে ৬২৭ শ্রমিক-কর্মচারীর চাকরি হারানোর ঘটনায় কারখানার সামনে শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান হারিয়ে অনেকে পরিবার চালানো এবং নতুন চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
