গ্যাস সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বাড়ছে লোডশেডিং

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি ও জ্বালানি সরবরাহের জটিলতা যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমেছে। ফলে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় কমবেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৭৯৭ মেগাওয়াট।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেভরনের বেস অ্যাসেটস ও উদীয়মান দেশবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার লা রোসার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।

আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহে ওঠানামা

গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট গত বুধবার রাত ১২টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে কেন্দ্রটির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে দেশে লোডশেডিং বেড়ে যায়।

রোববার সকালে বন্ধ ইউনিটটি মেরামতের পর দুপুর থেকে আবার উৎপাদন শুরু হয়। বিপিডিবি ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে আদানির দ্বিতীয় ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।

আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের রেকর্ড রয়েছে। আদানি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একটি ইউনিটের বয়লারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। রোববার ভোরে মেরামত শেষে ইউনিটটি পুনরায় চালুর জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং দুপুরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে।

বিপিডিবি ও পিজিসিবি সূত্র জানায়, রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে আদানির দুটি ইউনিট থেকে মোট ১ হাজার ৪৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। দুপুর ২টার দিকে সরবরাহ ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। এর আগে সকালে সর্বোচ্চ ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল।

রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে আদানির কেন্দ্রসহ ভারত থেকে মোট ২ হাজার ৫২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে। এর মধ্যে ভেড়ামারা এইচভিডিএস থেকে ৯১৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়। ওই সময় দেশে মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল প্রায় ৬৭০ মেগাওয়াট।

এর আগে ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ৭ আগস্ট থেকে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমতে শুরু করে। গত মাসের শেষ দিকে উৎপাদন বাড়িয়ে দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল কেন্দ্রটি। বুধবার রাতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়ালেও একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।

রামপাল কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে

আদানির কেন্দ্রের পাশাপাশি রোববার বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কারিগরি সমস্যার কারণে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লাভিত্তিক। এর আগে কয়লাস্বল্পতার কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে গিয়েছিল। বর্তমানে কেন্দ্রটিতে কয়লার মজুত রয়েছে এবং উৎপাদন ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি হচ্ছিল। তবে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোববার উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।

বিপিডিবি জানিয়েছে, রামপালের একটি ইউনিট কী কারণে বন্ধ হয়েছে, তা খুঁজে দেখতে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।

গ্যাসের ঘাটতিতে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন ব্যাহত

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৭টি। এর মধ্যে ৬৪টি সরকারি, ৭০টি বেসরকারি এবং তিনটি ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় এই সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, শনিবার গ্যাস সংকটের কারণে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন নিয়মিত কমছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির মাধ্যমে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বিদ্যুৎ, শিল্প, আবাসিক, বাণিজ্যিক, সিএনজি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস রেশনিং করে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ খাত চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না।

সংস্কারের তাগিদ

চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। বরং প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কত ব্যয় হচ্ছে এবং ভোক্তারা কী দামে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে দুর্নীতি শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং জাতীয় সক্ষমতা তৈরিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় কমাতে হবে।

তার মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রেখে জনস্বার্থ, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিতে পরিচালনা করা প্রয়োজন।