- নিজস্ব প্রতিবেদক
শিশু-কিশোরদের জন্য সহজ-সরল ভাষায় ছড়া, গল্প, গান ও নানা ধরনের সাহিত্য রচনা করে কয়েক প্রজন্মের পাঠকের মনে জায়গা করে নেওয়া শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার ও সাংবাদিক আখতার হুসেন আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন আখতার হুসেন। সম্প্রতি তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও রক্তচাপ কমে যাওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁকে বারডেম হাসপাতাল, গ্রিন লাইফ হাসপাতাল হয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
আখতার হুসেনের জানাজা বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব তেজগাঁওয়ের রেলওয়ে জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাঁর মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ সিরাজগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। তাঁর ছড়া, গল্প, গান, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর লেখা সহজ, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক ছন্দের কারণে শিশুদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর বহু লেখা বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পেয়েছে।
আখতার হুসেনের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এও তিনি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লেখা দিয়েছেন। শিশুদের উপযোগী সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ ও প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে অবসর নেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আখতার হুসেনের লেখনী সক্রিয় ছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। গানটির সুর করেছিলেন অজিত রায় এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন শিল্পী তিমির নন্দী।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আখতার হুসেন। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের দলীয় সংগীতের রচয়িতাও তিনি। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
সহকর্মী ও স্বজনদের কাছে আখতার হুসেন ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, আন্তরিক, হাস্যোজ্জ্বল ও নির্লোভ মানুষ। খ্যাতির প্রতি মোহ না রেখে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সাহিত্যকর্ম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। শিশু-কিশোর, তরুণ প্রজন্ম ও সহকর্মীদের উৎসাহিত করতেন তিনি।
সাহিত্য ও শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আখতার হুসেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতি পদক, মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে শিশুদের জন্য নির্মল আনন্দের যে জগৎ তিনি তৈরি করেছেন, তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টাকে হারাল বাংলা শিশুসাহিত্য। তাঁর লেখা ছড়া, গল্প ও গান আগামী প্রজন্মের পাঠকের কাছে তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।
