দেশের বৃহত্তম বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ আসন্ন গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও সমালোচনা তুলে ধরেছেন। তিনি এই প্রক্রিয়ায় “চালাকি” দেখছেন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটকে “নতুন বাংলাদেশ”-এর চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করাকে “বিভ্রান্তিকর ও অসৎ দাবি” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তার মতে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি হওয়া গণভোটে মাত্র একটি প্রশ্নের মাধ্যমে ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পক্ষে জনগণের সার্বিক অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তিকর এবং প্রকৃত পছন্দের সুযোগ সীমিত করে দেয়।
“কুমিল্লা-ফরিদপুর বিভাগ থেকে উচ্চকক্ষ— সব একসঙ্গে”:
আসিফ সালেহ একটি ফেইসবুক পোস্টে তার উদ্বেগের কথা বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি জানান, অনেক ভোটারই বুঝতে পারছেন না যে তাদের একটি ভোটেই একসাথে কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করা থেকে শুরু করে সাংবিধানিক উচ্চকক্ষ গঠনের মতো গভীর মৌলিক বিষয়েও সম্মতি দেওয়া হচ্ছে। তিনি নিজে, তার বাড়ির কাজের সহায়ক থেকে শুরু করে ব্যারিস্টার বন্ধু—সবাইকে এই গণভোট নিয়ে বিভ্রান্ত অবস্থায় দেখছেন।
জুলাই সনদের অন্তরালে ৮৪ প্রস্তাব:
গণভোটের ব্যালটে ভোটাররা শুধু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তাদের সমর্থন আছে কি না, সেই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। তবে আসিফ সালেহের মতে, এখানেই রয়েছে “একটু চালাকি”। কারণ এই সনদের আড়ালে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব।
“ভোটারদের পছন্দের সুযোগ কেড়ে নেওয়া”:
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক ৩০ দফা, উচ্চকক্ষ গঠন—এমন অসংখ্য গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের পক্ষে একসাথে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এর মানে হলো, একজন ভোটার নির্বাচন কমিশন সংস্কারের পক্ষে হলেও উচ্চকক্ষের বিপক্ষে থাকতে পারেন, কিন্তু এই ব্যবস্থায় তার সেই ভিন্নমত প্রকাশের কোন সুযোগ নেই।
“হ্যাঁ ভোটই কি পরিবর্তনের একমাত্র চাবি?”
আসিফ সালেহ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে—এ ধরনের প্রচারণার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভিডিও বার্তার উদাহরণ টেনে বলেন, এ ধরনের দাবি বিভ্রান্তিকর ও অসৎ। কোনো গণভোটই নিজে থেকে পরিবর্তন আনতে পারে না। পরিবর্তনের জন্য দরকার রাজনৈতিক আচরণ, দলীয় সংস্কার, জবাবদিহি ও বাস্তব প্রয়োগ। একটি ‘হ্যাঁ’ ভোটকে পরিবর্তনের একমাত্র শর্ত হিসেবে দেখানোকে তিনি “মিথ্যা আশা দিয়ে বোঝাপড়া চাপিয়ে দেওয়া” বলে মনে করেন।
স্বচ্ছতার অভাব ও তাড়াহুড়ো:
তিনি তার আপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের শুধু এইটাই বলা হচ্ছে কী কী সংবিধানে যুক্ত হবে, কিন্তু এর বাস্তবায়নের খরচ কত হবে, কীভাবে কাজ করবে বা বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করবে কি না—তা বলা হয়নি। তার মতে, গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ হয়, যখন তা পূর্ণ বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নেওয়া হয়। অজানা বা অস্পষ্ট বিষয়ে ভোটারদের কাছ থেকে সম্মতি আদয় করা হলে তা প্রকৃত সম্মতি নয়, কেবল একটি প্রক্রিয়াগত অনুমোদন মাত্র।
নির্বাচন-পরবর্তী বাধ্যবাধকতা ও বিভ্রান্তি:
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৮৪টি প্রস্তাবের অনেকগুলোর প্রতিই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের (বিএনপি, জামায়াতসহ) আপত্তি বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। আগে ধারণা ছিল যেসব দলের আপত্তি আছে, তারা ক্ষমতায় এলে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু এখন গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে আগামী সংসদকে এই ৮৪টি প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করা হবে। এতে নির্বাচন-পরবর্তী একটি বড় ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ‘না’ ভোট জিতলে পুরো জুলাই সনদই অকার্যকর হয়ে পড়বে।
আসিফ সালেহ তার বক্তব্য শেষ করেছেন একটি সোজা প্রশ্ন রেখে: “বলা হচ্ছে দেশের চাবি আপনার হাতে। আপনি কি আসলেই জানেন আপনি কোন তালা কোন চাবি দিয়ে খুলতে যাচ্ছেন?” তার এই সমালোচনা, তার মতে, পরিবর্তনের বিরোধিতা নয়, বরং একটি বিভ্রান্তিকর ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করার প্রচেষ্টা।
