জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকারসহ সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
সংস্থাটি নির্বাচনপূর্ব এই সময়ে মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে তার উদ্বেগ ও সুপারিশসমূহ একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তুলে ধরেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লেখা ওই চিঠিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং তার পূর্ববর্তী সময়টি হবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং আইনের শাসনের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতির একটি ‘পরীক্ষা’। তিনি লিখেছেন, “এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে, তা আগামী বহু বছরের জন্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।”
চিঠিতে মহাসচিব ক্যালামার্ড উল্লেখ করেন, অতীতের সরকারগুলোর আমলে বাংলাদেশে “গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার আটক, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার মত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা” ঘটেছে। তিনি স্বীকার করেন যে সরকার ‘গুম থেকে সকল ব্যক্তিকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ ও ‘নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকল (ওপিসিএটি)’ অনুসমর্থনের মতো কিছু পদক্ষেপ নিলেও, সার্বিক মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান।
নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ সম্পর্কে অ্যামনেস্টির উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারে বাধা, যা সংস্থার মতে নির্বাচনী পরিবেশকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ করতে পারে এবং জনগণের আস্থা ‘দুর্বল’ করতে পারে। চিঠিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না এবং আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়াও, চিঠিতে শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী বিক্ষোভে সহিংসতা, দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কার্যালয়ে হামলা, এক সম্পাদককে হয়রানি এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক পোশাককর্মীকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাগুলোও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। অ্যাগনেস ক্যালামার্ড এগুলোকে মানবাধিকার সুরক্ষায় ‘গুরুতর ব্যর্থতার’ ইঙ্গিত হিসাবে বর্ণনা করেন এবং এসব হামলার তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা ও ভবিষ্যতে প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন।
চিঠির শেষে, আসন্ন নির্বাচনে মানবাধিকার সুরক্ষাকে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানিয়ে অ্যামনেস্টির মহাসচিব লেখেন, “এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিক ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা, অধিকার প্রয়োগকারীদের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও আইনসম্মত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।”
গত ২৬ জানুয়ারি লেখা এই চিঠিটি বুধবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
