বকুলতলার ঐতিহ্য ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুদ্রঘরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো বসন্ত বরণ

ফাগুনের প্রথম দিন, ভালোবাসার দিন; বসন্তকে বরণ করতে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রাঙ্গণ আজ পরিণত হয়েছে বাসন্তী রঙের মিলনমেলায়। উৎসবপ্রেমীদের পদচারণায় জাদুঘরের লবিতেও যেন ঠাঁই মিলছিল না। সবাই সেজেছিলেন বাসন্তী রঙের পোশাকে; কেউ এসেছিলেন বন্ধুদের নিয়ে, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে। আর মঞ্চ থেকে ভেসে আসছিল শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাস’ থেকে শুরু করে বাংলা কালজয়ী গানের সুর, সঙ্গে ছিল নাচের তাল।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ফাগুনের প্রথম দিন বসন্ত বরণের যে ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিল, সেই ধারা এবার ভাঙল। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বকুলতলায় এবার আর উৎসবটি করা সম্ভব হয়নি। জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষৎ প্রথমবারের মতো আয়োজনটি স্থানান্তর করে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত চত্বরে।

পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট জানান, বকুলতলায় আয়োজনের চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হয়েছেন। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে আয়োজন সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে কেন বিকল্প ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া হলো, তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের শেকড়, আর বসন্ত আমাদের সংস্কৃতির শেকড়।” ১৯৯৪ সাল থেকে এই আয়োজন করলেও চারুকলার বকুলতলার বাইরে এবারই প্রথম উৎসবটি অনুষ্ঠিত হলো।

উৎসবে আসা দর্শনার্থীদের একজন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যুগ্ম-পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন। তিনি জানান, প্রতিবছরই তিনি বসন্ত উৎসবে যান। তবে এবার আয়োজনটি হবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। গতকাল একটি খবর থেকে উৎসবের কথা জানতে পেরে আজকে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরিচিতদেরও খবরটি জানিয়ে দেন।

সকাল ৮টায় জাদুঘরের লবিতে সমবেত যন্ত্র ও কন্ঠসঙ্গীতের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীরা এই পরিবেশনা উপস্থাপন করে। এরপর দিনভর নৃত্য ও সঙ্গীত দলের পরিবেশনা চলে। একক শিল্পীদের গান, শিশু-কিশোর ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনা ছাড়াও ছিল বসন্ত কথন পর্ব, প্রীতি বন্ধনী ও আবির বিনিময়। বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে এসব আয়োজন।

উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ বলেন, এবার আয়োজনটি করতে পারবেন কি না, তা নিয়েই তারা সন্দিহান ছিলেন। নির্বাচনে কারা ক্ষমতায় আসবে এবং তারা এ ধরনের আয়োজন করতে দেবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা ছিল। তবে আয়োজনটি করতে পেরে তারা আনন্দিত। এবার প্রচারণা তেমন করা না গেলেও অনেক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসবে যোগ দিয়েছেন।

পরিষদের সহ-সভাপতি কাজল দেবনাথ মনে করেন, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিচর্চার ‘বন্ধ জানালা’ খুলে গেছে। বিগত সময়ে ‘মব সন্ত্রাস’, ‘মাজারে হামলা’ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের কারণে সংস্কৃতিচর্চা একটি ‘বন্ধ্যা সময়’ পার করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এবারের আয়োজন সেই বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি এবং নতুন সরকারের কাছে সংস্কৃতিচর্চার এই জানালা খোলা রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

উৎসবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়। দলীয় সঙ্গীতে ছিল রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, বহ্নিশিখা, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, সুরবিহার, পঞ্চভাস্কর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, সুরতীর্থ ও কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর। দলীয় নৃত্যে অংশ নেয় ধৃতি নর্তনালয়, কথক নৃত্য সম্প্রদায়, অংশী, ভাবনা, নৃত্যাক্ষ, জাগো আর্ট সেন্টার, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, স্পন্দন, মম কালচারাল সেন্টার, ফিফা চাকমা গারো কালচারাল একাডেমি, আঙ্গিকাম, সাধনা, তুরঙ্গমী, নন্দ শিল্প একাডেমি, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র, বাংলাদেশ একাডেমি অব পারফর্মিং আর্ট ও কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর।

একক সঙ্গীতে ছিলেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, সুচি দেবনাথ, অনিমা রায়, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, আরিফ রহমান, ফেরদৌসী কাকলি, আবিদা রহমান সেতু, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, বেলায়েত হোসেন ও নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি ও আহসান দিপু।