ঢাকা: দেড় বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দুদিন আগের নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে রাজি না থাকলেও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার আপত্তি নেই। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয়ের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেন আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশা। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারিত হয়।
নির্বাচন প্রসঙ্গে জয়: ‘প্রহসন’, ‘সাজানো ভোট’
জয় বলেন, “আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে—তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক। এটাই আমার কৌশল; জীবনে সবসময়ই এভাবেই চলেছি।”
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের ফলাফলকে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ স্বাগত জানালেও জয় এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দেন।
“দেশের সবচেয়ে বড় দল এবং সব প্রগতিশীল দলকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। মূলত এমনভাবে সাজানো একটি নির্বাচন হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী তাদের জনসমর্থনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব সংসদে পায়। এটি টেকসই হবে না। ভবিষ্যতে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি নিষিদ্ধ—এমন নির্বাচনকে কীভাবে গ্রহণযোগ্য বলা যায়? যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লিবারেলদের যে কোনো একটি দল নিষিদ্ধ করা হত, সেটার সমতুল্য পরিস্থিতি এটি। একে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় না। অনির্বাচিত একটি শাসনব্যবস্থার নির্দেশে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা নজিরবিহীন ঘটনা।”
অতীতের আওয়ামী লীগের নির্বাচন
আওয়ামী লীগের শাসনামলের তিনটি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করলে জয় দাবি করেন, বিষয়টি ‘পুরোপুরি সঠিক নয়’।
“গত তিনবারের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয়বার বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে, নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলো দেখুন—আমেরিকানদের করা জরিপসহ সব জরিপেই দেখা গিয়েছিল আমাদের দল বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে কিছু অনিয়ম করেছেন। সেগুলো তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, হয়নি। তবে সামগ্রিক ফলাফলে তার প্রভাব পড়ত না।”
২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বিরোধী দলের জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে দাবি করেন, আওয়ামী লীগ কাউকে ‘নিষিদ্ধ করেনি’। তার ভাষায়, এটাই গত তিন নির্বাচনের সঙ্গে এবারের ভোটের ‘মৌলিক পার্থক্য’।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যদি এবারের নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলেন, সেটা মেনে নেবেন কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, “না, মেনে নেওয়া যায় না। দেশে যে অল্পসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন, তারা সরকারের তত্ত্বাবধানে চলাচল করছেন। কারণ তাদের স্বাধীনভাবে দেশের ভেতরে ভ্রমণের সুযোগ নেই, আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এতটাই খারাপ যে সেটি নিরাপদ নয়। তাহলে তারা আসলে কতটা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন?”
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও দমন-পীড়ন
চব্বিশের অভ্যুত্থান ও আন্দোলন প্রসঙ্গে জয় ‘কিছু ব্যর্থতা’ থাকার কথা স্বীকার করেন।
“আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণভাবেই শুরু হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল যৌক্তিক। আমাদের সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল বিষয়টি সঠিকভাবে জানাতে; শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে কথা বলতেও ব্যর্থ হয়েছিল।”
জয়ের দাবি, জামায়াতে ইসলামী ওই ‘সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায় এবং তারাই সহিংসতা শুরু করে।
আন্দোলনে নিহত ১,৪০০ জনের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, জাতিসংঘের দেওয়া এই সংখ্যার মধ্যে অর্ধেক পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন। তিনি দাবি করেন, “আমার মা কখনও কাউকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেননি, শুধুমাত্র যারা পুলিশ বা অন্যদের ওপর হামলা করছিল, তাদের ক্ষেত্রে ছাড়া। একটি সরকারের আর কী করার থাকে? মানুষের জীবন রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।”
শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে জয় দাবি করেন, বিবিসি ও আল জাজিরা অডিও টেপের একটি অংশ কেটে প্রচার করেছে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কখনও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ‘অনুমতি দেওয়া হয়নি’।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও মৃত্যুদণ্ড
শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া প্রসঙ্গে জয় বলেন, তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ তার বিশ্বাস, দেশের ‘অন্তত অর্ধেক জনগণ’ এই নির্বাচনকে কখনও ‘মেনে নেবে না’।
শেখ হাসিনা কখনও বাংলাদেশে ফিরবেন কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, “আমার কোনো সন্দেহ নেই, তিনি একদিন ফিরবেন। তিনি বহুদিন ধরেই অবসর নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে বাংলাদেশে; সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কোনো একসময় তিনি ফিরবেন।” তবে বর্তমানে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ‘একেবারেই নিরাপদ হবে না’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মায়ের ভারতে থাকা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন, কারণ তার বিবেচনায় ভারতই এখন শেখ হাসিনার জন্য ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা’। তিনি বলেন, “ভারত সরকার তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিচ্ছে। ভারতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে; বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া তার ধারেকাছেও যায় না। তাই তার নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই।”
জয়ের দেশে ফেরা ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
প্লট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া জয় দেশে ফিরবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশে থাকি না। আমার পুরো জীবনে মোট সাত বছর বাংলাদেশে কাটিয়েছি। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।” তবে একসময় দেশে ফিরবেন বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, “না, আমার কখনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। আমার কখনোই ক্ষমতা বা টাকার প্রতি লোভ ছিল না। আমি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলেই খুশি।”
তিনি আরও জানান, তার মা তাকে এক দশকের বেশি সময় ধরে নির্বাচনে দাঁড়াতে ও সংসদ সদস্য হতে উৎসাহ দিলেও তিনি তা চাননি।
বিএনপি ও তারেক রহমান
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে কথা বলবেন কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, “বিএনপি বাংলাদেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল। অবশ্যই তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত; আমি সবসময়ই সেটা বলে এসেছি। বিএনপির কখনোই নির্বাচন বর্জন করা উচিত হয়নি। আর তারেক রহমান… আমি বলছি, নির্বাচনটি ভুয়া, তবে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।”
আওয়ামী লীগের সংস্কার
আওয়ামী লীগের বড় ধরনের সংস্কার ও নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, “সংস্কার কোনো এককালীন প্রক্রিয়া নয়; এটি ধারাবাহিক ও চলমান বিষয়। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব নেতৃত্ব ঠিক করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটিও সম্ভব নয়; আমরা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছি না, দলীয় বৈঠক করতে পারছি না, সংবাদ সম্মেলন করতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দলীয় কর্মীরা কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকতে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি বদলাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব
বাংলাদেশে মুজিব পরিবার ও জিয়া পরিবারে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব প্রসঙ্গে জয়ের বক্তব্য, “এটা কি বংশানুক্রমিক রাজনীতি? আমরা নিজেরা রাজনীতিতে থাকতে চাই? নাকি তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ দলীয় কাউন্সিলে বারবার আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন? প্রশ্নটা সেখানেই।”
