তারেক রহমানের ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন: ‘জনগণের রায় পেয়েছি, এখন দেশ গড়ার পালা’

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় লাভ করার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে আগামী দিনের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

দেড় যুগেরও বেশি সময় লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর এটাই ছিল তারেক রহমানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংবাদ সম্মেলন।

‘এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের’

সংবাদ সম্মেলনে শুরুতে তারেক রহমান বলেন, “দেশের স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন।”

তিনি দেশের সকল জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আমরা দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছি।”

বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছেন। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছেন, এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”

দীর্ঘ ১৮ বছরের লড়াইয়ের স্বীকৃতি

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “এবার আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে চাই—শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটুট ছিলেন, অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা আমাদের। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি-আমি—আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”

সরকারের রূপরেখা ও ৩১ দফা ইশতেহার

নতুন সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “জনগণের রায় পেলে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারা দেশের জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছে দলীয় ইশতেহার।”

তিনি আরও জানান, একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। “আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ।”

শান্তিপূর্ণ বিজয় উদযাপনের নির্দেশ

নির্বাচনোত্তর সহিংসতা এড়াতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন বিএনপি প্রধান। তিনি বলেন, “আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে, শান্তির সাথে, দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করেছি। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এজন্য শত উস্কানির মুখেও আমি সারা বাংলাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য নির্বাচনোত্তর নিরঙ্কুশ জয়ের অর্জনের পরও আমি সারা দেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে বিজয় উৎসব পালন করেছি।”

আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার অঙ্গীকার

প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী হতে চলা তারেক রহমান সাফ জানিয়ে দেন, আইনের শাসনই হবে তার সরকারের মূলমন্ত্র।

“আমার বক্তব্য স্পষ্ট—যেকোনো মূল্যে অবশ্যই শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড আমরা বরদাশত করব না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই থাকুক, কোনো অজুহাতে অবশ্যই দুর্বলের ওপরে সবলের আক্রমণ আমরা মেনে নেব না।”

দেশ পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্ন মত—প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।”

প্রতিশোধ নয়, ঐক্যের আহ্বান

নির্বাচনী বিরোধ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ, প্রতিহিংসার রূপ না নেয়—সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য আমি আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “আসুন, যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম, একইভাবে এবার দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি। একটি নিরাপদ, মানবিক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্ন মতের সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।”

সামনে চ্যালেঞ্জ ও জবাবদিহিমূলক সরকার

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।”

তবে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।”

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে অভিনন্দন

এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপি প্রধান বলেন, “জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।”

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে, অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।”

জাতীয় ঐক্যের ডাক

সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই—দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তা-ভাবনা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে; সেজন্য আমরা সকলে ইনশাআল্লাহ ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং থাকতে হবে।”

সংবাদ সম্মেলন শেষে বিজয় চিহ্ন দেখান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে সাদা শার্ট পরে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তারেক রহমান হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে প্রবেশ করলে সেখানে উপস্থিত নেতারা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের দিকে হাত তুলে সালাম জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।

উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নোবেল শান্তিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের যাত্রার দেড় বছর পর বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।