পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা নিয়ে বাংলাদেশ সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও, পর্দার আড়ালে বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না—এ বার্তা দুই দেশকেই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের ভূমি দখল ইস্যুতে ওআইসির বিশেষ নির্বাহী কমিটির সভায় অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পর ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রকাশ্যে অবস্থান না নিলেও বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে দুই পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে।
সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের ফাঁকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে তার আলোচনা হয়। তবে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে কী ধরনের কথাবার্তা হয়েছে, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্তারিত জানায়নি।
উল্লেখ্য, ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে আফগানিস্তানের নঙ্গরহার ও পকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। দুই দিন পর সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ে গোলাগুলি ও পাল্টা হামলা। পরবর্তীতে ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন পয়েন্টে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, কামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করে মুখোমুখি অবস্থান নেয় দুই দেশের বাহিনী। পাকিস্তান তাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধের কথা স্বীকার করেছে, আর আফগানিস্তান জানিয়েছে তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
কেন বাড়ছে উত্তেজনা?
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত ও নিরাপত্তা প্রশ্নে টানাপোড়েনপূর্ণ। ডুরান্ড লাইন নিয়ে ঐতিহাসিক বিরোধ, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। সাম্প্রতিক বিমান হামলা সেই অবিশ্বাসকে আরও তীব্র করেছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধি এবং আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সংকট—দুই প্রেক্ষাপটই উত্তেজনা বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। সীমান্তে সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা কেবল দুই দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের প্রকাশ্য নীরবতা আসলে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। ইসলামাবাদ ও কাবুল—দুই রাজধানীর সঙ্গেই ঢাকার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রকাশ্যে পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে নেপথ্যে সংলাপ ও সংযমের বার্তা পৌঁছে দেওয়াকেই নিরাপদ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নে ওআইসির মতো প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চাইলে, সংঘাত নিরসনে মধ্যপন্থী অবস্থানই কার্যকর হতে পারে।
যদি এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে শরণার্থী সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই আন্তর্জাতিক মহল ইতোমধ্যে দুই পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো অস্থির, তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হলে উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সেই প্রচেষ্টায় নীরবে হলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায়—এটাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।
