মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার আগুনে পুড়ছে উত্তরবঙ্গের জ্বালানি বাজার। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় হঠাৎ করেই জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মোটরসাইকেল নির্ভর নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি থমকে গেছে। গত তিন দিন ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন, কেউ বা পাচ্ছেন কোটা নির্ধারিত সামান্য তেল।
শুক্রবার সকাল থেকে রাজশাহী নগরের প্রায় সবকটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি একটি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেল না পেয়ে অনেক স্টেশন শাটার টেনে দিতে বাধ্য হয়েছে। যেসব স্টেশনে তেল রয়েছে, সেখানেও সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি সীমাবদ্ধ। এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন হতভাগ্য গ্রাহকরা।
নগরীর ভাটাপাড়ার বাসিন্দা বখতিয়ার শাহরিয়ারের ভাষ্য, “বৃহস্পতিবার রাতে তিনটি স্টেশন ঘুরে মোট এক হাজার টাকার পেট্রোল পেয়েছি। এক জায়গায় ৫০০, আরেক জায়গায় ৩০০ টাকার তেল দিয়ে তারা বলেছে, এর বেশি দেওয়া সম্ভব না।”
রুয়েট এলাকার নয়ন ফিলিং স্টেশনে দেখা মেলে সবুজ আহমেদের। পেশায় তিনি একজন চাকরিজীবী, প্রতিদিন বাইক চালাতে হয়। তিনি বলেন, “তিন দিন ধরে তেলের জন্য দুশ্চিন্তায় আছি। অফিসের কাজে বের হয়েও তেলের জন্য পাম্পে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাধ্য হয়ে অনেক কাজ ফেলে রাখছি।”
পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী বিভাগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবেই এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। গত তিন দিন ধরে বিভাগের আট জেলার ২৭৯টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে বেশিরভাগই চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না।
তবে শুধু সরবরাহ ঘাটতি নয়, সঙ্কটের আরেকটি বড় মাত্রা যোগ করেছে মানুষের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক ও কৃত্রিম চাহিদা। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের খবরে অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে বাড়িতে মজুদ করতে শুরু করেছেন। যারা নিয়মিত বাইক চালান না, তারাও এখন তেল কিনে রাখছেন। অন্যদিকে যাদের বাইক চালানো প্রয়োজন, তারা একাধিক পাম্পে ঘুরে ট্যাংকি ভরছেন। ফলে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বাজারচাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি—এই সমীকরণে সঙ্কট আরও প্রকট হয়েছে। আব্দুল জলিলের ধারণা, পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রীয়ভাবে যদি জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী বিভাগে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করা না হয়, তাহলে এই সঙ্কট আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। টানা তিন দিন ধরে তেল সঙ্কটে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা। সঙ্কট মোকাবিলায় প্রশাসনের জরুরি উদ্যোগ না নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
