স্বল্প সময়ের ব্যবধানে উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের বৃদ্ধি দেশের বিমান খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে লিটারে প্রায় ৮২ টাকা বাড়িয়ে জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বড় মূল্য সমন্বয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সর্বশেষ নির্ধারিত দামে অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহৃত জেট এ-১ জ্বালানির প্রতি লিটার এখন ১৯৪ টাকা ১৮ পয়সা, যা ৮ মার্চের ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে গেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও ডলারে নির্ধারিত জ্বালানির মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন বাড়লো এত দ্রুত?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা, ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের ভিত্তিতেই এই সমন্বয় করা হয়েছে। মার্চের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের গড় মূল্য বেড়ে যাওয়ায় একটি পর্যালোচনা কমিটি নতুন দর নির্ধারণের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী ১৮ মার্চ থেকে নতুন মূল্য কার্যকর করা হয়।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী—
- অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে: শুল্ক ও ভ্যাটসহ প্রতি লিটার ১৯৪.১৮ টাকা
- আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে: শুল্কমুক্ত প্রতি লিটার ১.২৬৮৯ মার্কিন ডলার
এর আগে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত ধাপে ধাপে দাম বাড়লেও, সর্বশেষ ১০ দিনের ব্যবধানে বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি।
আন্তর্জাতিক প্রভাব কতটা?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি—জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
এর পাশাপাশি ডলারের শক্তিশালী অবস্থান আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে একই পণ্য কিনতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিমান ভাড়ায় প্রভাব পড়বে?
বিমান সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, জেট ফুয়েলের এমন আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। সাধারণত একটি ফ্লাইট পরিচালনার মোট খরচের বড় অংশই জ্বালানি ব্যয়—অনেক ক্ষেত্রে যা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
এই বাস্তবতায়—
- অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের দাম বাড়ার সম্ভাবনা বেশি
- আন্তর্জাতিক রুটেও ভাড়ার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে
- কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে
কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতির প্রশ্ন
এই ঘটনা শুধু মূল্যবৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে।
প্রথমত, বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, মাসভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের নীতি থাকলেও বাস্তবে স্বল্প সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে—
- জ্বালানি ক্রয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি
- বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান
- ডলার নির্ভরতা কমানোর কৌশল
গ্রহণ করা জরুরি।
সামনে কী হতে পারে
বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ, সামনে দাম আরও বাড়তে বা কমতে পারে—সবকিছু নির্ভর করবে বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।
সব মিলিয়ে, জেট ফুয়েলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিমান খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে যাত্রী পরিবহন ও পর্যটন খাতে এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
