বিদ্যুতের দাম সর্বস্তরে বাড়ল, কার্যকর জুন থেকে; গড়ে ১৬–২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি

দেশের সব শ্রেণির গ্রাহকের বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পাইকারি, খুচরা এবং সঞ্চালন—সব পর্যায়েই নতুন দর ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন মূল্যহার জুন মাস থেকেই কার্যকর হবে।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বা ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বা ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।


পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধি

বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী—

  • পাইকারি দাম: ৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা
  • খুচরা দাম: ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা
  • সঞ্চালন চার্জ: ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা

বিভিন্ন ধাপের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত।


সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা

বুধবার ঢাকার রমনায় কমিশন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্যরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চেয়ারম্যান বলেন, বাজেট ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও তিনি স্বীকার করেন।


সব খাতে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে

নতুন সিদ্ধান্তে প্রায় সব খাতেই বিদ্যুতের দাম বেড়েছে—

  • আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাত
  • কৃষি সেচ
  • ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প
  • শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
  • হাসপাতাল ও দাতব্য সংস্থা
  • রাস্তার বাতি ও পানির পাম্প
  • ইলেকট্রিক যানবাহন ও চার্জিং স্টেশন

কৃষি খাতে প্রভাব

সেচ পাম্পে বিদ্যুতের দাম ১৫ দশমিক ০৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে।

এর ফলে বোরো মৌসুমসহ শুষ্ক মৌসুমে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং কৃষকের লাভের হার কমে যেতে পারে।


ক্ষুদ্র শিল্পে চাপ

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে।

  • ফ্ল্যাট রেট: ১০ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা
  • অফ-পিক: ৯ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে ১১ টাকা ৪৫ পয়সা
  • পিক আওয়ার: ১২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ২৭ পয়সা

এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি হবে।


শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য খাতে বৃদ্ধি

এই খাতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। বৃদ্ধি প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ও দাতব্য হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


রাস্তা ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব

পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের রাস্তার বাতি এবং পানি পাম্পের বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে পানি ও সেবার খরচও বাড়তে পারে।


ইলেকট্রিক যানবাহনে প্রভাব

ইলেকট্রিক গাড়ি ও ব্যাটারি চালিত যানবাহনের চার্জিং স্টেশনে গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ দাম বেড়েছে।

এর ফলে ইজিবাইক ও অটোরিকশার চার্জিং খরচ বাড়বে এবং পরোক্ষভাবে যাত্রী ভাড়াও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


বাণিজ্যিক খাত

বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফ্ল্যাট রেটে ১৩ টাকা ১ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। এতে দোকান, শপিং মল ও অফিস পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং পণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে।


ভর্তুকির চাপ

বিইআরসি জানিয়েছে, দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।


গণশুনানি

২০ ও ২১ এপ্রিল গণশুনানির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয়। অংশীজনরা ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে কমিশন জানায়, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে।