দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যাপক নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা আগামী জাতীয় বাজেটে এ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য উৎস: চাই বাজেটের নীতিগত পরিবর্তন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই), ল-ইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট, যা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় খুবই কম। অথচ সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত ধারণাপত্রে বলা হয়, বর্তমানে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর প্রায় ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ কর কার্যকর রয়েছে। অথচ এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় মোট রাজস্বের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশেরও কম। এ অবস্থায় আগামী ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের কর ও শুল্ক প্রতীকী ১ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে এবং ১ হাজার ১৮০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করে। একইভাবে প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩১ হাজার টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে সক্ষম।
সাধারণ মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে উৎসাহিত করতে আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুদমুক্ত অর্থ সরবরাহ এবং উদ্যোক্তাদের ৫ শতাংশের কম সুদে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
প্রস্তাবিত ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ৬০ শতাংশ বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ৪০ শতাংশ বৃহৎ আকারের বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উদ্যোগের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ভর্তুকির সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতি বছর ১০ লাখ পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর দাবিও জানানো হয়।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিতে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, কর-শুল্ক ছাড় এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে দেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। সরকার কর ও শুল্ক কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগের পথ সহজ করলে তা জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (অধিকার ও সুশাসন) বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে, তবে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন। জ্বালানি খাতের সংস্কার ও ভর্তুকির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
এ সময় ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম, লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামানসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
