অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি’। একই সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (৭ জুন) বিকেল ৪টায় রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আয়োজিত সম্মিলিত গণপ্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠিও পাঠানো হয়।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এই মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য হুমকিস্বরূপ। চুক্তি কার্যকর হলে কৃষি, শিল্প, হাঁস-মুরগি পালন, দুগ্ধশিল্প, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় কমে যাবে এবং ভর্তুকির অতিরিক্ত চাপ জনগণের ওপর এসে পড়বে।
তিনি বর্তমান সরকারের নীরবতার সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি। ভবিষ্যতে চুক্তির কারণে যে সংকট সৃষ্টি হতে পারে, তার দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হবে।
বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন পরাশক্তির প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে এসে দেশকে স্বনির্ভর করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে লেখা খোলা চিঠি পাঠ করেন। পরে মোশাহিদা সুলতানা, গবেষক মাহতাব উদ্দীন এবং ছাত্রনেতা রাফিকুজ্জামান ফরিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে গিয়ে চিঠিটি জমা দেয়।
চিঠিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে জাতীয় সংসদ অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণকে না জানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে এমন কিছু ধারা রয়েছে, যা দেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে দাবি করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, নির্বাচনের আগে ঘোষিত রাজনৈতিক অঙ্গীকারে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই চুক্তি বহাল থাকলে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদেরও এ বিষয়ে সংসদে কার্যকর ভূমিকা না রাখার সমালোচনা করা হয়।
চুক্তির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আরোপ করা পারস্পরিক শুল্ককে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে। ফলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের আইনগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়।
চিঠিতে চলমান সংসদ অধিবেশনেই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থবিরোধী এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে জড়িতদের তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
গবেষক মাহতাব উদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী, নারী, ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
এ সময় বক্তব্য দেন অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, আইনজীবী মানজুর আল মতিন, গবেষক পাভেল পার্থ এবং এনপিএর কেন্দ্রীয় নেতা বাকী বিল্লাহসহ অন্যরা।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির ডাকে আয়োজিত কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র, জাতীয় গণফ্রন্ট, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এবং গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন।
সমাবেশ চলাকালে গানের দল ‘কোরাস’ ও ‘সমগীত’ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গান পরিবেশন করে। এছাড়া নাট্যদল ‘প্রাচ্যনাট’ পথনাটক মঞ্চস্থ করে।
সমাবেশের শেষ পর্যায়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আগামী জুলাই মাসে বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে বৃহত্তর জনসমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেন।
