ব্যক্তিস্বার্থের কাছে হার মেনেছে আদর্শ, গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের নিয়ে হাসনাত কাইয়ুমের আক্ষেপ

দেশে বিকল্প রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা থাকলেও ব্যক্তিগত পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষার কারণে সেই সুযোগ নষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। তার অভিযোগ, গণতন্ত্র মঞ্চের অনেক নেতা রাজনৈতিক আদর্শ ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাবকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘গণভোট, রাষ্ট্র সংস্কার ও সিরাজুল আলম খানের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

হাসনাত কাইয়ুম বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চ গঠনের সময় যেসব ব্যক্তি ও সংগঠনকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেকে পরবর্তীতে আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে গেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামান্য রাজনৈতিক সুবিধা, সংসদীয় আসন কিংবা মন্ত্রিত্বের আশায় অনেকেই নিজেদের ঘোষিত নীতি ও লক্ষ্য বিসর্জন দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “যাদের হাতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল, তাদের একটি অংশ সামান্য লাভের জন্য সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে। ফলে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তব রূপ পায়নি।”

গণ-অভ্যুত্থানের সুফল ভোগ করে অন্যরা

গণ-আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, দেশের ইতিহাসে জনগণ বারবার আন্দোলন-সংগ্রামে জীবন দিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়নি। বরং একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বারবার সেই অর্জন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা সেই চক্র ভাঙার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র মঞ্চকে সংগঠিতভাবে পাশে পাইনি। যদিও তাদের কয়েকজন নেতার সহযোগিতা পেয়েছিলাম।”

আন্দোলনে ভুল কৌশলের সমালোচনা

অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত বিজয়ের আশায় আন্দোলনের সঙ্গে নানা ধরনের সুবিধাবাদী ও অবিশ্বস্ত ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে জনগণের ত্যাগের ফসল বারবার অন্যদের হাতে চলে গেছে।

হাসনাত কাইয়ুমের মতে, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার প্রবণতা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোতেও দেখা গেছে।

তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মুক্তি ও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে সিরাজুল আলম খানের প্রস্তাবিত ১৯৭২ সালের জাতীয় সরকারের ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার সমালোচনা

আলোচনা সভায় অনলাইন গণমাধ্যম চরচার সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের নামে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, “প্রতিটি আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। কিন্তু আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।”

তার মতে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সংস্কারপ্রক্রিয়া ও উচ্চকক্ষ গঠনের বিতর্কও আগামী কয়েক বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি সীমিত একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত থাকে, তাহলে সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

অংশীদারত্বমূলক শাসনের পক্ষে মত

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী। তিনি বলেন, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সিরাজুল আলম খান অংশীদারত্বভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা দিয়েছিলেন।

তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ

সভায় জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে স্থানীয় জনগণ ও বিজিবিকে পুশ-ইন প্রতিরোধে দিনরাত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো ভারতের কাছে যথেষ্ট দৃঢ় বার্তা দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংস্কার ও ঐক্যের আহ্বান

সভাপতির বক্তব্যে জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব বলেন, জনগণের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত সংস্কারই এখন সময়ের দাবি।

তিনি সিরাজুল আলম খানের আদর্শ অনুসরণ করে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং দেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে দল-মত নির্বিশেষে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

জেএসডির সাংগঠনিক সম্পাদক সামসুল আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন গবেষক ও পেশাজীবী সংগঠক হেলালুজ্জামান, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. তৌহিদ হোসেন, মো. সিরাজ মিয়াসহ অন্য নেতারা।