রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল থেকে মামলার সম্পূর্ণ রেকর্ড হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের নির্দেশে মামলার নথি উচ্চ আদালতের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠানো হয়।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ জানান, ৬৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় এবং তিন পৃষ্ঠার ডেথ রেফারেন্সসহ মোট ৭২ পৃষ্ঠার নথি লাল কাপড়ে মুড়িয়ে হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে।
অধস্তন আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, বিকেল ৪টার দিকে মামলার কেস ডকেট হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল গণমাধ্যমকে জানান, দুই কার্যদিবসের মধ্যে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করা সম্ভব হলে আগামী সপ্তাহেই শুনানির জন্য বিষয়টি হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হতে পারে।
গত রোববার এ মামলার রায়ে বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পাশাপাশি সোহেলের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়। অর্থদণ্ডের টাকা আদায়ে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রদান করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
ডেথ রেফারেন্স কী
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকর হওয়ার আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়াকেই ডেথ রেফারেন্স বলা হয়।
রায় ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট আদালত মামলার যাবতীয় নথি উচ্চ আদালতের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠায়। পরে ডেথ রেফারেন্স ও দণ্ডিত আসামিদের আপিল একত্র করে যে ভলিউম প্রস্তুত করা হয়, সেটি পেপারবুক নামে পরিচিত। এই পেপারবুকের ভিত্তিতেই হাইকোর্ট মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি করে থাকে।
যেভাবে ঘটেছিল ঘটনাটি
পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করত দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার। একই ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট হিসেবে থাকতেন সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার।
গত ১৯ মে দুপুরে সোহেলদের বাসা থেকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে আটক করা হয়। পরে সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না জানান, সোহেল রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। পরে মরদেহ গোপন করার উদ্দেশ্যে তা বিকৃত করে বাসার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। ঘটনার পর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান সোহেল।
ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় সোহেল ও স্বপ্নাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরদিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সোহেল। পরে উভয় আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
দ্রুত তদন্ত ও বিচার
ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পরে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়।
ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। একই দিন মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটিও বাতিল করা হয়। ১ জুন আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে বিচারক সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
পরদিন একদিনেই ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। অন্যদিকে সোহেল রানা আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও অভিযোগ অস্বীকার করে খালাস চান।
৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানান। অপরদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ আসামিদের লঘুদণ্ড প্রার্থনা করেন।
রায়ে বিচারকের পর্যবেক্ষণ
রায়ে বিচারক মাসরুর সালেকীন বলেন, “শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার এই ঘটনা কেবল একটি ফৌজদারি মামলার বিচার নয়, এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি একটি কঠিন পরীক্ষা।”
তিনি আরও বলেন, “একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি।”
বিচারকের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন যৌন নির্যাতন, সহিংসতা বা হত্যার শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকেই গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
