ইতালিতে পাঠানোর নামে ভয়াবহ ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চক্রটি প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠানোর পাশাপাশি বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫৬টি পাসপোর্ট, ১৫৩টি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত সিল, একটি এম্বোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ আড়াই লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে যাওয়ার প্রত্যাশী মানুষকে টার্গেট করে ইতালির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অভিবাসী চোরাচালান আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী এক নারী তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে যাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্নের চেষ্টা করছিলেন। তার স্বামী বহু বছর ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। পরবর্তীতে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা নবায়নের জন্য দূতাবাস থেকে যোগাযোগ করা হয়।
দূতাবাসে যাওয়ার পর ওই নারীর পরিচয় হয় গ্রেপ্তার নাজমুল হাসানের সঙ্গে। তিনি নিজেকে পাসপোর্ট নবায়ন ও ইতালির ভিসা প্রক্রিয়ায় সহায়তাকারী হিসেবে পরিচয় দেন এবং দ্রুত কাজ সম্পন্নের আশ্বাস দেন। পরে তাকে গুলশানের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চক্রের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত মো. বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
চক্রটি ওই নারীকে ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করে। একপর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। টাকা পরিশোধের পর তাকে তার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায় যখন ভুক্তভোগী তার সন্তানদের নিয়ে ইতালিগামী ফ্লাইট ধরতে বিমানবন্দরে যান। ইমিগ্রেশন কার্যক্রমের সময় তিনি জানতে পারেন, তার পাসপোর্টে সংযুক্ত ইতালির ভিসা ব্যবহার করে এরই মধ্যে অন্য এক নারী গত ২৪ এপ্রিল ইতালিতে প্রবেশ করেছেন।
এ তথ্য জানার পর ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন যে, তার পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করে অন্য কাউকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডির মানবপাচার শাখা তদন্ত শুরু করে। তদন্তে চক্রটির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করত। এরপর সেগুলো নিজেদের হেফাজতে রেখে বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করত।
জব্দ করা ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি সিলের উপস্থিতি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির মূলহোতা মো. বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই ধরনের কৌশলে অন্তত ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। এছাড়া তিনি একই ধরনের অপরাধে ২০২৪ সালে দায়ের করা আরেকটি মামলায় বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
বর্তমানে সিআইডির মানবপাচার শাখা মামলাটির তদন্ত করছে। জব্দ করা পাসপোর্ট, কম্পিউটার ও অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি চক্রটির দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে কাজ চলছে।
এ ঘটনায় সিআইডি বিদেশগামীদের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর করা উচিত নয়। একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত ও বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিবাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
