নারায়ণগঞ্জে জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলায় প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হয়ে নিহত এক আন্দোলনকারীর ভাই শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
বুধবার (১০ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বেঞ্চে মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় একজন শহীদের ভাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তার বক্তব্যে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি চালিয়ে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯ জুলাই এবং ৫ আগস্ট দুই দিনই হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে এসব হত্যাকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন।
মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন জুলাই আন্দোলনে নিহত স্বজনের বড় ভাই মো. আবুল বাশার অনিক। আদালতে দেওয়া তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জালকুড়ি-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড এলাকায় আন্দোলন চলাকালে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমানসহ বিপুলসংখ্যক অস্ত্রধারী ব্যক্তি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করেন। ওই ঘটনায় আদিল ও আবুল হোসেন মিজি নামে দুজন নিহত হন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জবানবন্দিতে অনিক আরও বলেন, ৫ আগস্ট সকালে তিনি তার ভাইকে নিয়ে চাষাড়া মোড়ে আন্দোলনে যোগ দিতে যান। এ সময় ল্যাবএইড হাসপাতালের পাশের একটি গলিতে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, তানভীর রহমান টিটু, শাহ নিজাম, আব্দুল করিম বাবু, কামরুল হাসান মুন্না, ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাসহ বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র ব্যক্তি আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন।
তার দাবি, অয়ন ওসমানের হাতে থাকা পিস্তল থেকে ছোড়া একটি গুলি তার ভাই স্বজনের বুকে বিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে ভর্তি বা চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে আহত স্বজনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় কাজলা ফ্লাইওভারের কাছেও হামলার শিকার হতে হয়। সেখানেও তাদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ছোড়া হয়েছিল বলে তিনি আদালতকে জানান।
অনিক তার জবানবন্দিতে আরও বলেন, অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরলে তার ভাই জানতে চান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে কি না। শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেছেন এমন খবর জানার পর তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে প্রতিক্রিয়া জানান। এরপর আর কোনো কথা বলেননি। পরদিন ৬ আগস্ট বিকেলে তার মৃত্যু হয়।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই এবং ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সাইনবোর্ড এলাকায় সংঘটিত পৃথক ঘটনায় ১০ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় তিনটি পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরবর্তীতে গত ৪ মার্চ পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১৯ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করা হয়।
গত ১৩ মে ট্রাইব্যুনাল-১ প্রসিকিউশনের উত্থাপিত তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়ে শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই সঙ্গে ১০ জুন সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তদন্তের স্বার্থে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান ও আজমেরী ওসমান ছাড়া বাকি নয় আসামির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে। প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
