জুলাই আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং একই ঘটনায় দুজনকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আবারও নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন গ্রেপ্তার পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার।
বুধবার (১০ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন আদালতে পুনরায় সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, এএসআই চঞ্চল ছাড়াও আরও কয়েকজন সাক্ষী রয়েছেন, যাদের জবানবন্দি গ্রহণ প্রয়োজন।
দুই পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল দুপুরের পর চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পুনরায় সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ করে। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার আরও একজন সাক্ষীর জবানবন্দির দিন ধার্য করা হয়েছে।
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের দেওয়া একটি স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ফুটেজের ফরেনসিক পরীক্ষায় সত্যতা পাওয়া গেছে। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ায় তিনি মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণের আবেদন করেন।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কার্নিশে ঝুলে থাকা এক নিরীহ ব্যক্তিকে গুলি করার অভিযোগ রয়েছে এএসআই চঞ্চলের বিরুদ্ধে। তার দেওয়া বক্তব্যের একটি ভিডিও কনটেন্ট ক্রিয়েটর পিনাকী ভট্টাচার্যের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই ফুটেজ আদালতে দাখিল করা হলে ফরেনসিক পরীক্ষায় এটি এডিটেড বা কৃত্রিমভাবে তৈরি নয় বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, আজ অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজেই সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন, যেখানে তিনি আগের বক্তব্যের অস্তিত্ব পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন। সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি প্রথমবার সাক্ষ্য দিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। গত ৪ মার্চ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত থাকলেও নতুন ডিজিটাল প্রমাণ উপস্থাপনের কারণে তা পিছিয়ে যায়।
এই মামলায় মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার থাকা একমাত্র আসামি এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। বাকি চারজন পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান এবং সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আন্দোলনের সময় আমির হোসেন নামের এক তরুণ প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন। পুলিশ ধাওয়া করলে তিনি ছাদের কার্নিশে ঝুলে পড়েন। ওই অবস্থাতেই এক পুলিশ সদস্য তাকে লক্ষ্য করে ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। গুলিবিদ্ধ হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
একই ঘটনায় ওইদিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে দুজন নিহত হন। আহত হন ছয় বছরের শিশু বাসিত খান মুসা। গুরুতর আহত অবস্থায় দীর্ঘ চিকিৎসার পরও শিশুটি এখনও কথা বলতে পারছে না বলে জানা গেছে।
গত বছরের ৭ আগস্ট মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের ধারাবাহিকতায় মামলাটি এখন রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
