আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে বরাদ্দ ৩৯৩ কোটি টাকা বেড়েছে, যা মোট বাজেটের ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বরাদ্দ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৫৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ১৪ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৯৫ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা, ফলে নতুন অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ২.৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অতীতের নানা দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব খাতটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ভর্তুকি ও মূল্যস্ফীতিতে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও জনগণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
সংকট মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র আধুনিকায়ন, সিস্টেম লস কমানো, বিতর্কিত চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং সঞ্চালন নেটওয়ার্ক উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। পাশাপাশি সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আগামী তিন বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে বিস্তৃত সিসমিক জরিপ, নতুন কূপ খনন এবং পুরনো কূপ সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে এলএনজি টার্মিনাল সম্প্রসারণ, পাইপলাইন ব্যবহারের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিতকরণ, এসপিএম প্রকল্প দ্রুত চালু এবং নতুন তেল শোধনাগার স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং শিল্প ও সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
