- উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি; একদিনের সফরে একাধিক প্রকল্প উদ্বোধন
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা, কৃষি ও শিল্প খাতকে সহায়তা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই নতুন বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অথচ বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করে দেশে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
শনিবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো কক্সবাজার সফরে গিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন তারেক রহমান। সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বাজেট, উন্নয়ন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। একই দিনে তিনি খাল পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন, বৃক্ষরোপণ, নতুন পৌরসভা ও উপজেলা কার্যক্রমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, কবর জিয়ারত এবং জনসভায় অংশ নেন।
সকালে কক্সবাজার পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে পাতিলী-মাছুয়াখালী খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। সেখানে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পণ্যের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি না পায়।
তার ভাষায়, চাল, ডাল, তেল, লবণসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমানোর কারণে বাজেট ঘোষণার পরও বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি। জনগণের জীবনযাত্রা সহজ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বাজেটে কর কমানো হয়েছে সেটিও তারা গ্রহণ করছে না, আবার যেসব পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে কর বাড়ানো হয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। এতে বিরোধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ নয়; বরং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করা।
এদিকে সংসদে উপস্থাপিত নতুন বাজেটকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে কড়া সমালোচনা করেছে। দলটির পক্ষ থেকে বাজেটকে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর, বাস্তবায়ন-অযোগ্য এবং সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কক্সবাজারের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সে কারণে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিনির্ভর কিছু পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে বাজেটে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগও বিরোধী দলের সমর্থন পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বক্তব্যে দেশের মালিকানা প্রসঙ্গেও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা পরিবার নয়, বাংলাদেশের জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক। দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী প্রজন্ম নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ পাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সফরের শুরুতে পাতিলী খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তারেক রহমান। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে তিনি প্রকল্পের কাজের সূচনা করেন এবং পরে খালপাড়ে একটি কাঠবাদাম গাছের চারা রোপণ করেন।
স্থানীয়দের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একই খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। সেই উদ্যোগের ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি সেচ সুবিধার আওতায় আসে। ওই সময় তার রোপণ করা একটি খেজুরগাছ এখনো এলাকায় বিদ্যমান রয়েছে।
দুপুরে পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা এলাকায় গিয়ে জুলাই আন্দোলনের নিহত শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খোঁজখবর নেন।
এ সময় ওয়াসিমের পরিবারের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দেওয়া হয়। ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে নিহত হন।
সফরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্থানীয় সরকার কাঠামোর সম্প্রসারণ। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে নতুন মাতামুহুরী উপজেলা ও থানা ভবন নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করেন।
পেকুয়া পৌরসভা প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিএনপি অতীতেও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে এবং ভবিষ্যতেও জনগণের উন্নয়নে কাজ করে যাবে। পেকুয়ার প্রশাসনিক উন্নয়ন সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন এবং মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনও ছিল। দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
সফরের শেষ পর্যায়ে চকরিয়ায় জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। বিকেল থেকেই হাজারো মানুষ সেখানে জড়ো হন। স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন বিষয়ক বিভিন্ন প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
একদিনের এই সফরে উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন, পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচি, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের নানা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন প্রধানমন্ত্রী।
