অ্যাটর্নি জেনারেলকে ঘিরে বিতর্কিত অভিযোগপত্র: একদিকে জিডি, অন্যদিকে ‘ভয় দেখানোর চেষ্টা’ অভিযোগ

  • ফেসবুকে ছড়ানো অভিযোগকে মানহানিকর দাবি; নম্বর ব্যবহারের অভিযোগে পৃথক জিডি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে নিয়ে একটি অভিযোগপত্র ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগপত্রটিকে ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। তবে জিডিতে উল্লেখিত ফেসবুক আইডির মালিক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম ইব্রাহিম খলিল পাল্টা অভিযোগ করেছেন, তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের প্রকৃত মালিকও পরিচয় জালিয়াতির অভিযোগ এনে থানায় পৃথক জিডি করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত নাম ও স্বাক্ষরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

শাহবাগ থানায় দায়ের করা জিডি অনুযায়ী, গত ১১ জুন ‘Adv Abm Ibrahim Khalil’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে সেটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

জিডিতে বলা হয়েছে, অভিযোগপত্রে উত্থাপিত তথ্যের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। সেখানে জানুয়ারি মাসে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আনা হলেও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল চলতি বছরের ২৫ মে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। ফলে অভিযোগটির সময়কাল বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে অভিযোগপত্রে প্রধান বিচারপতি, চেম্বার জজ, সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম ও কজলিস্ট সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সন্দেহ, এ ঘটনার পেছনে দপ্তরের কিছু চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কর্মচারীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

অন্যদিকে, নিজের নাম জড়ানো প্রসঙ্গে আইনজীবী এ বি এম ইব্রাহিম খলিল বলেন, অভিযোগপত্রটি বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর তিনি কেবল বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে সেটি নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন।

তার ভাষ্য, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ব্যাখ্যা জানতে চাওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। তিনি বলেন, তার পোস্টে কোথাও অভিযোগকে সত্য বলে দাবি করা হয়নি; বরং প্রকৃত ঘটনা জানতে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।

জিডিতে শুধুমাত্র তার নাম উল্লেখ করার সমালোচনা করে ইব্রাহিম খলিল বলেন, একই অভিযোগ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়ালেও তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সক্রিয় অবস্থান এবং বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনামূলক লেখালেখির কারণেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, এটি মূলত তাকে ভয় দেখানোর একটি প্রচেষ্টা। তার ভাষায়, মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত করতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে জিডি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার যে অভিযোগ জিডিতে করা হয়েছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং একজন নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল। ফলে বিষয়টিকে রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।

চিঠির সত্যতা যাচাই না করেই শেয়ার করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার পোস্টের উদ্দেশ্যই ছিল অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে জনমনে থাকা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। তিনি নিজে কোনো অভিযোগ তৈরি করেননি কিংবা প্রচারণা শুরু করেননি বলেও দাবি করেন।

পুরো ঘটনার পেছনে অ্যাটর্নি জেনারেলের অতিরিক্ত প্রচারপ্রবণতা কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, আলোচনায় থাকার মানসিকতা থেকেই এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়ে থাকতে পারে।

এদিকে বিতর্কিত অভিযোগপত্রে অভিযোগকারী হিসেবে ‘ফিরোজুর রহমান’ বা ‘ফিরোজপুর রহমান’ নাম ব্যবহার করা হলেও সেখানে দেওয়া মোবাইল নম্বরটি ফিরোজ আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তির বলে জানা যায়। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি গত ১০ জুন বংশাল থানায় জিডি করেন।

জিডিতে ফিরোজ আহম্মেদ উল্লেখ করেন, তার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানতে পারেন। কিন্তু তিনি নিজে এমন কোনো অভিযোগ করেননি এবং পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগতও নন।

তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত নাম তার নয়, শুধু মোবাইল নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণেই তিনি আইনগত সুরক্ষার জন্য জিডি করেছেন।

প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আইন মন্ত্রণালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনারও আহ্বান জানান তিনি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. পলাশ বলেন, ফিরোজ নামের এক ব্যক্তি নিজের পরিচয় ও মোবাইল নম্বর অপব্যবহারের অভিযোগে জিডি করেছেন। প্রাথমিকভাবে এটি পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে।

তিনি জানান, অ্যাটর্নি জেনারেলকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঘটনায় ওই ব্যক্তি নিজেকে দায়মুক্ত রাখতেই জিডি করেছেন। বিষয়টির পরবর্তী কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হবে।