আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল: রোগীসেবা ও শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের নতুন নির্দেশনা

রাজধানীর আদ্-দ্বীন উইমেনস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর সেখানে চিকিৎসাধীন ও রেফার হওয়া রোগীদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা এবং মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখতে পৃথক নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ওই হাসপাতাল থেকে পাঠানো রোগীদের চিকিৎসাসেবায় যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর মেডিকেল কলেজটির শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ অন্য হাসপাতালে করার নির্দেশ দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়া রোগীদের দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অনুমোদন রয়েছে বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।

এ নির্দেশনার অনুলিপি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতেও নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন, ২০২২-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। মেডিকেল শিক্ষার কারিকুলাম অনুযায়ী তৃতীয় বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ শুরু হয় এবং এমবিবিএস পাসের পর এক বছরের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়।

হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় এসব কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হবে না।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. রুবীনা ইয়াসমীন বলেন, “হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হলেও মেডিকেল কলেজ বন্ধ হচ্ছে না। আমরা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্য অন্য হাসপাতালে সংযুক্ত করার নির্দেশ দিচ্ছি।”

তিনি জানান, মেডিকেল কলেজটিকে একটি জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করতে হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের ওই হাসপাতালে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাবে এবং ফিরিয়ে আনবে। তারা কোন হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, সে বিষয়ে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে অধিদপ্তরকে জানাতে হবে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি জেনারেল হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এবার সরকারের পক্ষ থেকে আদ্-দ্বীনকে সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গেই চুক্তিবদ্ধ হতে হবে।

গত শনিবার নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার ‘কঠোর অবস্থানে’ রয়েছে এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত সেই নীতিরই প্রতিফলন।

তিনি দাবি করেন, হাসপাতালটির পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে আমার পেছনে ঘুরেছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এবং আপনাদের দোয়ায় আমি কোনো প্রলোভনে পা দিইনি। সরকারও আমাকে এ বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। তাই অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।”

জামায়াতে ইসলামীর কিছু নেতার সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে কেউ কেউ অন্যায় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তবে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মতো ঘটনার পর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, একটি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা দেশের বেসরকারি হাসপাতাল খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।

গত ২৭ মে সকালে মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছয় নবজাতক মারা যায়। ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গেলে একটি টিভি স্টেশনের সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হন হাসপাতাল কর্মীরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার প্রমাণ’ পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা ও বিকল্প বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা না থাকা এবং বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়াই শিশুদের মৃত্যুর কারণ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ‘সন্তোষজনক না হওয়ায়’ গত বৃহস্পতিবার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।