পোশাক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্যে সংসদে তর্ক-বিতর্ক, বক্তব্যের অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ

  • জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক এবং বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে করা এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের একটি অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

রোববার (১৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যকে ঘিরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

মনিরুল হক চৌধুরী, যিনি কুমিল্লা-৬ আসন থেকে নির্বাচিত, বক্তব্যের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকে তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে এবং অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

বক্তৃতার একপর্যায়ে তিনি ২০০১ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। সে সময় এক অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে স্ত্রীসহ উপস্থিত হতে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি একটি মন্তব্য করেন, যা পরে সংসদে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

এরপর তিনি বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তারা মেধাবী ও সম্ভাবনাময় হলেও তাদের পরিচয় ও উপস্থাপন নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চান। এ মন্তব্যের পরপরই বিরোধী দলের সদস্যরা আসন থেকে দাঁড়িয়ে তীব্র আপত্তি জানান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সংসদে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে তিনি কয়েক দফা সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

এক পর্যায়ে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, তিনি কাউকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেননি, বরং অতীতের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তবুও কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

পরে ডেপুটি স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পর্কিত যে অংশটি নিয়ে আপত্তি উঠেছে, তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তে বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।

রুলিংয়ের পর ডেপুটি স্পিকার বলেন, জাতীয় সংসদের সদস্যদের আচরণ ও বক্তব্যে শালীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বক্তব্যে সেই মর্যাদা প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

জবাবে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে তিনি আশা করেননি। তার বক্তব্যের কোনো অংশে কেউ আহত হয়ে থাকলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে তার কোনো আপত্তি নেই। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, তার বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আলোচনার একপর্যায়ে তিনি বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতির কারণ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশংসা করেন এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যেরও ইতিবাচক মূল্যায়ন করেন।

তবে সংসদের বাইরে বিএনপিবিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করলে আবারও কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

আছরের নামাজের বিরতির পর বিষয়টি নতুন করে উত্থাপন করেন বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সংসদে দেওয়া ওই বক্তব্যে বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে এবং তা সংসদীয় শিষ্টাচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ডেপুটি স্পিকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করা এবং নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে মন্তব্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা রয়েছে। একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যে সেই সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রতিফলিত হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য থেকে সবাই বিরত থাকবেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।