নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর-সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি

বর্তমান এসআরও বহাল থাকলে ২০৩০ সালের সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন বলে আশঙ্কা বিএসআরইএর

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হলেও এর সুফল দেশের অধিকাংশ ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছাবে না বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। সংগঠনটির দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারিকৃত সংশ্লিষ্ট এসআরওতে সুবিধাগুলো সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর করা হয়েছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সামগ্রিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বাজেট ঘোষণার পর প্রকাশিত এসআরও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কর ও শুল্ক সুবিধার বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং রেসকো (RESCO) মডেলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আবাসিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক খাতের ব্যবহারকারীরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিস্তৃত বাজার গড়ে উঠেছে আমদানিকারক, পরিবেশক, ডিলার, খুচরা বিক্রেতা এবং ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু বিদ্যমান প্রণোদনা কাঠামোয় এসব অংশীজনের জন্য কার্যকর কোনো সুবিধা রাখা হয়নি। এর ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিএসআরইএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এসআরও দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর মাত্র ২০ থেকে ২২ শতাংশের জন্য কার্যকর হতে পারে। অথচ অধিকাংশ গ্রাহক এই সুবিধার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সংগঠনটির মতে, রেসকো মডেল মূলত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উপযোগী হলেও সাধারণ আবাসিক, কৃষি ও গ্রামীণ গ্রাহকদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বাজেট ঘোষণার পর অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পণ্যের দাম কমে গেছে। বাস্তবে অধিকাংশ সৌর সরঞ্জামের ক্ষেত্রে কর ও শুল্ক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এতে বাজারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা অপ্রয়োজনীয় চাপের মুখে পড়ছেন।

সংগঠনটির অভিযোগ, চলতি বাজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরওতে সোলার ইরিগেশন, সোলার স্ট্রিট লাইট এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) খাতের জন্য কার্যকর কোনো নতুন প্রণোদনা রাখা হয়নি। দেশে প্রায় ১৭ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প থাকলেও সেগুলোকে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য সুস্পষ্ট নীতিগত সহায়তা কিংবা আর্থিক প্রণোদনার প্রতিফলন বাজেটে অনুপস্থিত।

বিএসআরইএ আরও জানায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘ওয়েট-বেইজড অ্যাসেসমেন্ট’ পদ্ধতি বহাল রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু’ ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় প্রকৃত আমদানি মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্যায়নের কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক ও বিইএসএসের ওপর প্রদত্ত শুল্ক সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, দেশে এখনও এসব পণ্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। ফলে নির্ধারিত সময়ের পর সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ৬৩ শতাংশই আবাসিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বর্তমান প্রণোদনা ব্যবস্থায় তাদের জন্য সরাসরি কোনো সুবিধা নেই। একই সঙ্গে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং পেমেন্ট সিকিউরিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বাজেটে নতুন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিএসআরইএর আশঙ্কা, বিদ্যমান এসআরও অপরিবর্তিত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট পিক (এমডব্লিউপি) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার জাতীয় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পিক সক্ষমতা অর্জিত হতে পারে।

তবে সংগঠনটির দাবি, সকল আমদানিকারক, ইপিসি প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য শূন্য শতাংশ কাস্টমস ডিউটি ও কর সুবিধা উন্মুক্ত করা হলে শুধু ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর ২৫ শতাংশ ছাদ ব্যবহার করেই ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলন থেকে সোলার মডিউল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজ, মাউন্টিং স্ট্রাকচার, ডিসি কেবল, কানেক্টর ও স্মার্ট মিটারসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সব সরঞ্জামের জন্য সমান শুল্ক সুবিধা কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি অন্তত ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে ও আয়কর অব্যাহতি, আবাসিক ও কৃষি গ্রাহকদের জন্য কর সুবিধা এবং সোলার ইরিগেশন, সোলার হোম সিস্টেম, রুফটপ সোলার ও বিইএসএসকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণার দাবি জানানো হয়।

মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোনো বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য সুবিধা নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এ খাতের প্রণোদনা ব্যবস্থা সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।”

সংবাদ সম্মেলনে বিএসআরইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি জাহিদুল আলম, সহ-সভাপতি এম এ তাহের, সাধারণ সম্পাদক মো. আতাউর রহমান সরকার রোজেল, পরিচালক (অর্থ) নিতাই পদ সাহা, তোফায়েল আহমেদ, গ্রুপ সি ও সুপারস্টার গ্রুপসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।