সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া একটি অভিযোগপত্রকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগপত্রটিকে ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ দাবি করে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। একই ঘটনায় অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের প্রকৃত মালিক পরিচয় জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বংশাল থানায় পৃথক জিডি করেছেন।
অন্যদিকে, জিডিতে উল্লেখিত ফেসবুক আইডির মালিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ বি এম ইব্রাহিম খলিল দাবি করেছেন, অভিযোগের সত্যতা জানতে চাওয়াকে কেন্দ্র করেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি মূলত তাকে ভয় দেখানো এবং মতপ্রকাশে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা।
শনিবার (১৩ জুন) শাহবাগ থানায় দায়ের করা জিডিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন বাদী হন। জিডিতে বলা হয়, ‘Adv Abm Ibrahim Khalil’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগপত্র প্রকাশ করা হয়। পরে সেটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, অভিযোগপত্রে জানুয়ারি মাসে একটি মামলায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন চলতি বছরের ২৫ মে। ফলে অভিযোগের সময়কাল ও তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, চিঠিতে প্রধান বিচারপতি, চেম্বার জজ, সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম এবং কজলিস্ট নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচারের পেছনে দপ্তরের কিছু চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
তবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে অ্যাডভোকেট এ বি এম ইব্রাহিম খলিল বলেন, অভিযোগপত্রটি বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি কেবল বিষয়টির সত্যতা জানতে চেয়ে নিজের টাইমলাইনে শেয়ার করেছিলেন।
তিনি বলেন, “একজন সাধারণ নাগরিক ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি জানতে চেয়েছি অভিযোগটি সত্য কি না। তিনি দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা বা সত্যতা জানতে চাওয়া নাগরিক অধিকার।”
অ্যাটর্নি জেনারেলের পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিভিন্ন পেজে অভিযোগটি ছড়ালেও জিডিতে শুধু আমার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এটি অতি-উৎসাহী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।”
নিজেকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে দাবি করে ইব্রাহিম খলিল বলেন, “আমি নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখি। আমার লেখালেখিকে তারা হয়তো অস্বস্তিকর মনে করছেন। আমাকে ভয় দেখিয়ে কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যেই এ জিডি করা হয়েছে।”
জিডিতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ তোলার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি। তার মতে, অভিযোগটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়; বরং একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত হয়েছে। ফলে বিষয়টিকে রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
চিঠির সত্যতা যাচাই করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি পোস্টে সরাসরি জানতে চেয়েছিলাম, ‘আসল ঘটনাটি কী?’। অর্থাৎ সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যেই বিষয়টি শেয়ার করেছিলাম।”
তিনি আরও দাবি করেন, পুরো ঘটনাকে ঘিরে অ্যাটর্নি জেনারেলের ‘অতিরিক্ত প্রচারমুখী মানসিকতা’ কাজ করেছে এবং আলোচনায় থাকার প্রবণতা থেকেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বিতর্কিত অভিযোগপত্রে ‘ফিরোজুর রহমান’ বা ‘ফিরোজপুর রহমান’ নামে একজনের স্বাক্ষর এবং একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়। তবে ওই নম্বরের প্রকৃত মালিক ফিরোজ আহম্মেদ দাবি করেছেন, অভিযোগপত্রের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
গত ১০ জুন তিনি বংশাল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। সেখানে উল্লেখ করেন, তার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে বলে জানতে পারেন। কিন্তু তিনি কখনও এমন কোনো অভিযোগ করেননি এবং পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগতও নন।
ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, “আমার নাম ফিরোজ আহম্মেদ। কিন্তু অভিযোগপত্রে অন্য নাম ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু মোবাইল নম্বরটি আমার হওয়ায় আমি জিডি করেছি।”
তিনি প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে আইন মন্ত্রণালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনারও দাবি জানান।
বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. পলাশ জানান, ফিরোজ আহম্মেদের পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ প্রতারণামূলকভাবে অভিযোগ দাখিল করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ানো হয়েছিল। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার জন্য জিডি করেছেন।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি মূলত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদন্তসাপেক্ষ এবং প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
