দেশের তীব্র গ্যাস সংকট মোকাবিলা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি টেলিফোনে সরাসরি কথা বলেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি পাঠান। পরদিন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়ায় চিঠিটি হস্তান্তর করেন। একই দিন দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনও হয়।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা কমাতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ফোনালাপে আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান দিতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রুত সহায়তা পাওয়া গেলে সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ আগে থেকেই কাজ করছে। পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কারিগরি অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং জ্বালানি খাতে অন্যান্য সহযোগিতার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক উত্তর পাওয়ার পর সহযোগিতার ধরন ও সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক।
গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতেও জ্বালানি সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওই বিবৃতিতে এলএনজি সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পেট্রোলিয়াম খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাস এবং পেট্রোবাংলার মধ্যে সরাসরি এলএনজি সংক্রান্ত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
এদিকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) সৃষ্ট কারিগরি ত্রুটি এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট গ্যাস সংকট নিয়েও মঙ্গলবার সচিবালয়ে বৈঠক করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। বৈঠকে টার্মিনালটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির আঞ্চলিক পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, কোম্পানিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট আজিজ কাসিম সরকারের কাছে তাদের মেরামত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এ সময় সরকারের উদ্বেগ ও সমস্যার বিষয়গুলোও তাদের অবহিত করা হয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির কর্মকর্তারা পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি বলেন, কোম্পানির পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই টার্মিনাল থেকে দৈনিক ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহের শেষ নাগাদ পুরো টার্মিনাল সচল করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, জাপানের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প উৎস সীমিত হওয়ায় একটি এফএসআরইউতে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় ৯০০ থেকে ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
ফলে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। দৈনিক প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে আগে থেকেই ঘাটতি থাকলেও বর্তমানে তা আরও বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের গ্যাস ঘাটতি চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর থেকেই টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আগুনে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম এবং তথ্য পরিবহনকারী গুরুত্বপূর্ণ তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশি প্রকৌশলীদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞরাও মেরামত কাজে অংশ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
