আষাঢ়ের প্রথম দিনে বর্ষার সৌন্দর্য, প্রকৃতির বৈচিত্র্য এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সামনে রেখে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য ‘বর্ষা উৎসব’ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও আলোচনার সমন্বয়ে আয়োজিত এই উৎসবে উঠে এসেছে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বাস্তবতার নানা প্রসঙ্গ।
সোমবার সকালে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত উৎসবের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’। সকাল সাড়ে ৭টায় শিল্পী জাবীর ইমাম খান শাহীর পরিবেশিত রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’-এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
এরপর কামরুল হাসান ফেরদৌসের নির্দেশনায় ‘বহর’ নৃত্যদল দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে। নৃত্যের পর নজরুলসংগীত শিল্পী মাহমুদুল হাসান একক সংগীত পরিবেশন করেন। পরবর্তী পর্বে আবারও মঞ্চে আসে ‘বহর’ নৃত্যদল।
অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় উদীচী ঢাকা মহানগরের শিল্পীরা সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। পরে লোকসংগীত শিল্পী বিমান বিশ্বাস লোকগানের পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন। তিনি উকিল মুন্সীর বিখ্যাত গান ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে’ পরিবেশন করেন।
সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘বর্ষা কথন ও আলোচনা’ পর্ব। উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক একরাম হোসেন এ পর্বের উপস্থাপনা ও লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
আলোচনায় অংশ নেন লেখক, গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা, উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন।
এ সময় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। লিখিত বক্তব্যের পর জামসেদ আনোয়ার তপন পরিবেশ ও জনজীবন সংশ্লিষ্ট ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দেশে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যেখানে নানা ধরনের অস্থিরতা ও উদ্বেগ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। এই বাস্তবতায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
উদীচীর পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকৃতি ধ্বংসকারী প্রকল্প বন্ধ, নির্বিচারে গাছ কাটা রোধ, সুন্দরবন সুরক্ষায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দখলমুক্ত নদী নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বন্যা ও মৌসুমি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালুর দাবি।
আলোচনা পর্বে গওহর নঈম ওয়ারা বর্ষাকালে কদম ফুল সংরক্ষণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কদম ফুল বিভিন্ন পাখির খাদ্যের উৎস। তাই গাছ থেকে কদম ফুল না ছেঁড়া এবং বাজার থেকে কদম ফুল না কেনার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
আলোচনা শেষে পুনরায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অনিমা রায় একক সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর গান পরিবেশন করেন মীর সাখাওয়াত।
পরবর্তী পর্বে অনিক বসুর পরিচালনায় ‘স্পন্দন’ নৃত্যদল দলীয় নৃত্য উপস্থাপন করে। পরে একে একে একক সংগীত পরিবেশন করেন রুদ্র দাস ও মায়েশা সুলতানা উর্বি।
সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাঝে আবৃত্তিশিল্পী সজীব তানভীর একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সমবেত সংগীত পরিবেশন করে উদীচীর উত্তরা শাখা।
উৎসবের শেষাংশে হুমায়রা তাসিন, অদ্বয় স্যান্যাল আর্য এবং জাকির হোসেন একক সংগীত পরিবেশন করেন। সবশেষে উদীচীর ডেমরা শাখার বিশেষ দলীয় পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দিনের আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
পুরো অনুষ্ঠান যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন মৌমিতা জান্নাত, সজীব তানভীর, রুমি দে ও আজাদ অরণ্য।
