একজন সুস্থ মানুষের কাছে এক ব্যাগ রক্ত হয়তো সামান্য বিষয়। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার বা কিডনি রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষের কাছে সেটিই জীবন বাঁচিয়ে রাখার প্রধান ভরসা। বিশ্ব রক্তদাতা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন অনুভূতির কথাই তুলে ধরেছেন নিয়মিত রক্তগ্রহীতা ও থ্যালাসেমিয়া রোগী রিপা তাসনিম।
রাজধানীর মালিবাগে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বৃহস্পতিবার আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে রিপা বলেন, রক্তের কোনো বিকল্প নেই। এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী মানুষেরা শুধু রক্তই দান করেন না, অসংখ্য রোগীর জীবন চলার শক্তিও জোগান।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিয়মিত রক্ত গ্রহণ অপরিহার্য। একইভাবে ক্যানসার ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসাতেও রক্তের প্রয়োজন হয়। একজন দাতার দেওয়া এক ব্যাগ রক্ত রোগীদের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনজুর মোরশেদ।
তিনি বলেন, বর্তমানে ফাউন্ডেশনের রোগীদের প্রয়োজন মেটাতে প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে ৩২ জন নিয়মিত রক্তদাতা পাওয়া যাচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এ সংখ্যা ৫০ জনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় রক্তপরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ মুরাদ সুলতান বলেন, স্বেচ্ছায় রক্তদান মানবিক দায়িত্বের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। যারা নিয়মিত রক্তদান করেন, তারা নীরবে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করছেন। তিনি দেশে শতভাগ স্বেচ্ছাসেবী রক্তদান ব্যবস্থা চালুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত রক্তদান করলে জাতীয় রক্তের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশ এখনো সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিশেষজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, নিয়মিত রক্তদাতাদের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ ও পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিরতিতে রক্তদান এবং রক্তদানের পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা ভারী কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
বক্তারা বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১১ হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রতি নয়জন মানুষের মধ্যে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক। তাই বিয়ের আগে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস’ পরীক্ষা করে বাহক শনাক্ত করা গেলে রোগটি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তাঁরা জানান, যদি বাবা ও মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে একজন বাহক এবং অন্যজন সুস্থ হলে সেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কল্যাণে সর্বাধিকবার রক্তদানকারী ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন রক্তদাতা সংগঠনের প্রতিনিধিদের সম্মাননা স্মারক ও সনদ প্রদান করা হয়।
এ সময় রোগী প্রতিনিধি ও রক্তদাতারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। দিবসটি উপলক্ষে ফাউন্ডেশনের সম্মেলনকক্ষে দিনব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়। এতে তরুণ রক্তদাতাদের পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের কর্মীরাও অংশ নেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দা মাসুমা রহমান এবং মুগদা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের কনসালট্যান্ট জান্নাতুল ফেরদৌস।
