জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদদের আত্মত্যাগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে।

 

উদ্বোধন উপলক্ষে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই জাদুঘর কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার স্থান নয়, বরং জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

রাজধানীতে বুধবার (৫ আগস্ট) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম, অপহরণ, হত্যা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু প্রাণ হারান এবং কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ আহত হন।

তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণসহ নানা ধরনের সহিংসতা চালিয়েছিল, যা সভ্য বিশ্বের জন্য বিরল ঘটনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে গুম, খুন, অপহরণ ও নিপীড়নকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশে পরিণত করা হয়েছিল। সেই ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামের বাস্তবতা জানাতে স্মৃতি জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাদুঘরটি শুধু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংগ্রাম ও সাংবিধানিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও সংরক্ষণ করবে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন সম্পর্কে আরও সমৃদ্ধ ধারণা লাভ করবে।

বক্তব্যে তিনি বলেন, ইতিহাসকে বিকৃত বা অতিরঞ্জিত না করে তথ্যনির্ভরভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ অসম্পূর্ণ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বর্ণনা ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের কারণ হতে পারে। তাই জাদুঘরের প্রতিটি তথ্য যথাসম্ভব নির্ভুল ও যাচাইকৃত হওয়া প্রয়োজন।

 

তিনি আরও বলেন, জাদুঘরে শহীদদের পরিচয়, জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াললিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক এবং অন্যান্য ডিজিটাল উপকরণ সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি এসব তথ্য বাংলা ছাড়াও ইংরেজি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় উপস্থাপন করা হলে বিদেশিরাও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন।

জাদুঘরের জন্য যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত স্মারক, দলিল, আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম প্রদান করেছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের বিচার আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি বলে মত দেন।

বক্তব্যে তিনি জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের নামে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সড়কের নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়। এর প্রকৃত নায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম ছিল, তেমনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। তাই শহীদদের অবদানও জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়েও বক্তব্যে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালে আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে তাঁদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। ৩১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার এবং জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিও কাজ শুরু করেছে।

দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যাতে পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তির পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

সবশেষে তিনি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট স্থপতি, ইতিহাসবিদ, গবেষক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, সংগ্রাহক, কারিগর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় জনগণের পাশে থাকার জন্য সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানান এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।