বাজেট প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নেই, অর্থনৈতিক দর্শনেও পরিবর্তন হয়নি: আনু মুহাম্মদ

দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও বাজেট প্রণয়নের নীতিনির্ধারক ও অর্থনৈতিক দর্শনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর মতে, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া এখনো আমলাতন্ত্র, বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবমুক্ত নয়; ফলে সাধারণ মানুষের মতামত ও প্রয়োজন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টনে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনা: উন্নয়ন দর্শন ও কাঠামোগত সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।

আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় পরিবর্তন আসে না। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী, নারী, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। ফলে বাজেটকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্য নেই। প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রেণিগত, লিঙ্গভিত্তিক, জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্য কমানো এবং জনগণকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।

উন্নয়ন কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিবর্তে কেনাকাটা ও প্রকল্পনির্ভর কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক নেই, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অবকাঠামো ও ক্রয়কেন্দ্রিক ব্যয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আলোচনা সভায় বক্তারা প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন নীতিগত ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করেন।

মোশাহিদা সুলতানা বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও সক্ষমতা ভাতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, সরকার বাজেটকে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলে দাবি করলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয়কৃত ও আমলানির্ভর। তাঁর মতে, বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ ব্যয় কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়, আর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পায় মাত্র ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরতা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন করে তুলবে।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, টিকাদান ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনো কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সভায় উপস্থাপিত বক্তব্যে মাহতাব উদ্দীন আহমেদ সরকারি ওয়েবসাইটে বাজেট-সংক্রান্ত তথ্যের স্বল্পতা এবং তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতার ঘাটতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জনগণের কাছে বাজেটের তথ্য সহজলভ্য না হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান সংস্কৃতি খাতে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম শক্তিশালী করতে জাতীয় আয়ের ২ শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দের দাবি জানান।

এ ছাড়া সুরাইয়া ইয়াসমিন কলি লিঙ্গসংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে আরও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

বক্তারা বলেন, জনগণের চাহিদা ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলে বাজেট আরও কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী হতে পারে।